এমপি ফিরোজের বাউফলে জুয়েল-মোতালেবের হানা

5
মোট ৯ বার পেয়েছেন দলীয় মনোনয়ন। এমপি হয়েছেন ৭ বার। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদেও আছেন ৪০ বছর ধরে। দীর্ঘ সময়ের এই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নিজের মতো করে গড়া আওয়ামী লীগেই এখন চরম বিরোধিতার মুখে জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ সংসদ-সদস্য আ.স.ম ফিরোজ। নিজ দলের পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান দু’জনই তার বিরুদ্ধে। প্রায়ই সংঘাত সংঘর্ষের সঙ্গে চলে রাজনৈতিক কর্মসূচির পালটা-পালটি উদযাপন। বিরোধীপক্ষের দাবি, একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় এলাকায় দলের ভেতরে স্বৈরতন্ত্র চালাচ্ছেন এমপি ফিরোজ। আওয়ামী লীগ নয়, এখানে আছে কেবলই ফিরোজ লীগ। এমপি ফিরোজ অবশ্য তা মানতে নারাজ। তার মতে, সমস্যাটা কিছু ব্যক্তির। জনগণ এবং দলীয় সমর্থন প্রশ্নে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। আওয়ামী লীগের মতো এখানে বিএনপিতেও চলছে নানা অশান্তি। জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বে বিভক্ত দলটি। জেলা ও কেন্দ্রের নেতারাও বিব্রত বিষয়টি নিয়ে। এমপি ফিরোজের ৪০ বছরের সাম্রাজ্যে হানা : শুরুটা হয়েছিল ২০১২ সালে। বাউফল উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-২ আসনে তখন চলছিল পৌর নির্বাচনের প্রস্তুতি। যথারীতি পছন্দের একজনকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেন আ.স.ম ফিরোজ। দলীয় মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়া জিয়াউল হক জুয়েল হন বিদ্রোহী প্রার্থী। ভোটযুদ্ধে জিতেও যান। মূলত তখন থেকেই শক্তিশালী হতে শুরু করে এমপি ফিরোজবিরোধী বলয়। মেয়র হওয়ার পর চার পাশে দলীয় নেতাকর্মীদের বেশ বড় একটা সম্মিলন ঘটান জুয়েল। ১০ বছরে তা পরিণত হয়েছে মহীরুহে। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে আরও শক্তিশালী হন জুয়েল। বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেখানে মনোনয়ন দেয় না দল সেখানে জুয়েলের হাতে নৌকা ওঠার বিষয়টিকে কেন্দ্রের গ্রিন সিগনাল হিসাবে ধরে নেয় সবাই। নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আবারও মেয়র হন তিনি। এদিকে ফিরোজ-জুয়েলের এই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে আওয়ামী লীগ। চলতে থাকে দফায় দফায় সংঘর্ষ আর হামলা-পালটাহামলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে পর্যন্ত সংঘর্ষে জড়ায় দুই গ্রুপ। কোন্দলের বলি হন যুবলীগ কর্মী তাপস। এরই মধ্যে এমপি ফিরোজের সঙ্গে বিরোধ বাধে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদারের। এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার পাশাপাশি আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন শুরু করেন তিনি। মোতালেবের এই বিরোধিতায় পালে হাওয়া লাগে ফিরোজ-জুয়েল দ্বন্দ্বে। প্রকাশ্যে জুয়েল-মোতালেব যৌথভাবে কোনো কর্মসূচিতে যোগ না দিলেও সবাই ধরে নেয় গোপন সমঝোতা রয়েছে দু’জনের মধ্যে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের এমন ধারাবাহিক বিরোধিতায় কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন ফিরোজের কর্মী-সমর্থকরা। এমপি ফিরোজের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ জুয়েল-মোতালেবের : কী কারণে এই বিভক্তি, প্রশ্ন করা হলে পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল বলেন, ‘৪০ বছরে কি বাউফলে এমন একজন তৈরি হয়নি যিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে পারেন? তিনি (এমপি ফিরোজ) হুইপ ছিলেন, চিফ হুইপ ছিলেন, ৭ বার এমপি, তার পরও যখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটা আঁকড়ে রাখেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে একক আধিপত্যের নেশায় পেয়েছে তাকে। নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে ত্যাগী পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে কমিটিতে ঢুকিয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের লোকজন। তার (ফিরোজ) বিরোধিতা মানেই আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়া। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে পর্যন্ত তার লোকজন দিয়ে কমিটি করতে হবে। অথচ যারা বংশপরম্পরায় আওয়ামী লীগ করেন, যার বাবা এমপি ছিলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তাদের রাজনীতি করতে বাধা দেন। একটাই ভয়, কেউ যদি টপকে যায়। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। যুগ যুগ ধরে এভাবে সবপর্যায়ে বিরোধিতা তৈরি হলেও নির্ভর করার মতো কেউ না থাকায় চুপ ছিল সবাই। এখন মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। সবাই তার বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে।’ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাউফল উপজেলার চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘উপজেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সভাপতি ছিলাম। এখন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। কখনোই তার (এমপি ফিরোজ) বিরুদ্ধে যাইনি। অথচ হঠাৎ করেই তিনি আমাকে সাইজ করা শুরু করলেন। হয়তো ভেবেছেন ভবিষ্যতে আমি এমপি মনোনয়ন চাইব। তিনি কাউকে বিশ্বাস করেন না। যখন যাকে মনে হয় কাছে টানেন আবার ছুড়ে ফেলে দেন। এখন আবার পরিবারতন্ত্র কায়েমের মিশন নিয়েছেন। ছেলে রায়হান শাকিবকে উপজেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি করেছিলেন। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে অবশ্য শেষ পর্যন্ত মিশন সফল হয়নি। এর আগে ছেলেকে দিয়ে মনোনয়নও দাখিল করিয়েছিলেন। তিনি আসলে আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে গড়ছেন ফিরোজ লীগ। এসবের পাশাপাশি অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়গুলো তো রয়েছেই। এভাবে তো আর দল চলতে পারে না।’ যা বললেন এমপি আ.স.ম ফিরোজ : দলের দুই প্রভাবশালী নেতার এসব অভিযোগ শুরুতেই উড়িয়ে দেন এমপি ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিপর্যায়ে সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগে কোনো সমস্যা নেই। এখানে দল চলে গণতান্ত্রিক পন্থায়। আমি যখন কারও অন্যায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেই না তখনই আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ওঠে। একনায়কতন্ত্র চালালে এলাকার মানুষ আমাকে ৭ বার ভোট দিত? হাজার বিরোধিতা করেও আমার প্রতি জনগণের যে সমর্থন তা কি কেউ টলাতে পেরেছে?’ পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এমপি-মন্ত্রীর ছেলেমেয়েরা রাজনীতি করতে পারবে না, এমনকি কোনো বিধান আছে? যোগ্যতা থাকলে আমাদের সন্তানরা অবশ্যই রাজনীতি করবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমি আমার ছেলেকে কোনোরকম স্পেস দিচ্ছি কিনা সেটা। তার যোগ্যতা থাকলে-জনসমর্থন থাকলে সে অবশ্যই রাজনীতি করবে। না থাকলে করবে না, এটা নিয়ে তো কথা বলার কিছু নেই। দল এবং জনগণ আমার ওপর আস্থা রেখেছে, এটাই আমার জন্য জরুরি, কে কি বলল তাতে কিছুই আসে যায় না।’ মনোনয়ন দ্বন্দ্বে বিভক্ত বিএনপি : আওয়ামী লীগের মতো এতটা জটিল না হলেও বাউফলে বিএনপির অভ্যন্তরেও রয়েছে নানা সমস্যা। তৃণমূলে দল পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সেখানে এখন রয়েছে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। সম্প্রতি এই কমিটি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ঘোষণা করেছে নতুন কমিটির নেতাদের নাম। আর এই ঘোষণা নিয়েই প্রকাশ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। একসময় এই বাউফলে বিএনপির হাফ ডজনেরও বেশি নেতা চাইতেন দলীয় মনোনয়ন। বর্তমানে অবশ্য সংখ্যাটি নেমে এসেছে মাত্র দু’জনে। এরা হলেন-এই আসনের সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার এবং দলের কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন। এই মুনির হোসেনের বাবা আব্দুর রশিদ চুন্নু আবার পটুয়াখালী জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে বিএনপির যে নয়া কমিটি ঘোষিত হয়েছে তার বিরোধিতায় নেমেছেন শহিদুল আলম তালুকদার। অর্থের বিনিময়ে এবং নিজস্ব লোকজন দিয়ে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার। যুগান্তরকে শহিদুল আলম বলেন, ‘মুনির হোসেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক। কেন্দ্রে বসে তিনি এখানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তার বাবা জেলা কমিটির আহ্বায়ক। সেই সুবাদে প্রথমেই বাউফলে আহ্বায়ক কমিটি বানিয়েছেন নিজস্ব লোকজন দিয়ে। এখন আবার চলছে ইউনিয়ন পর্যায়ে পছন্দের লোকজন বসানোর মিশন। তাতেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না যদি সম্মেলন এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে হতো। কিন্তু তারা ঢাকায় বসে ইচ্ছেমতো কমিটি বানিয়ে পাঠিয়েছে। কমিটির পদ বিক্রি নিয়ে সদস্য-সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজের সঙ্গে নেতাদের ফোনালাপের অডিও রেকর্ডও ভাইরাল হয়েছে। এসব ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রে অভিযোগ দিয়েছেন। এখন দেখি কেন্দ্রীয় নেতারা কী সিদ্ধান্ত দেন।’ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনির হোসেন বলেন, ‘যতদূর জানি সম্মেলন ও ভোটাভুটির মাধ্যমে কমিটি হয়েছে। এখানে আমার প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নই আসে না। শুধু শুধু আমাকে জড়ানো হচ্ছে। বাউফলে বিএনপি এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। নিয়মিত দলীয় কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কথা বলা মানে দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা।’ বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বাউফলে ইউনিয়ন কমিটি গঠন নিয়ে কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বসব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রিপোর্ট পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র।

নিউজ ডেস্ক: মোট ৯ বার পেয়েছেন দলীয় মনোনয়ন। এমপি হয়েছেন ৭ বার। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদেও আছেন ৪০ বছর ধরে। দীর্ঘ সময়ের এই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নিজের মতো করে গড়া আওয়ামী লীগেই এখন চরম বিরোধিতার মুখে জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ সংসদ-সদস্য আ.স.ম ফিরোজ। নিজ দলের পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান দু’জনই তার বিরুদ্ধে। প্রায়ই সংঘাত সংঘর্ষের সঙ্গে চলে রাজনৈতিক কর্মসূচির পালটা-পালটি উদযাপন। বিরোধীপক্ষের দাবি, একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় এলাকায় দলের ভেতরে স্বৈরতন্ত্র চালাচ্ছেন এমপি ফিরোজ। আওয়ামী লীগ নয়, এখানে আছে কেবলই ফিরোজ লীগ। এমপি ফিরোজ অবশ্য তা মানতে নারাজ। তার মতে, সমস্যাটা কিছু ব্যক্তির। জনগণ এবং দলীয় সমর্থন প্রশ্নে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। আওয়ামী লীগের মতো এখানে বিএনপিতেও চলছে নানা অশান্তি। জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বে বিভক্ত দলটি। জেলা ও কেন্দ্রের নেতারাও বিব্রত বিষয়টি নিয়ে।

এমপি ফিরোজের ৪০ বছরের সাম্রাজ্যে হানা : শুরুটা হয়েছিল ২০১২ সালে। বাউফল উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-২ আসনে তখন চলছিল পৌর নির্বাচনের প্রস্তুতি। যথারীতি পছন্দের একজনকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেন আ.স.ম ফিরোজ। দলীয় মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়া জিয়াউল হক জুয়েল হন বিদ্রোহী প্রার্থী। ভোটযুদ্ধে জিতেও যান। মূলত তখন থেকেই শক্তিশালী হতে শুরু করে এমপি ফিরোজবিরোধী বলয়। মেয়র হওয়ার পর চার পাশে দলীয় নেতাকর্মীদের বেশ বড় একটা সম্মিলন ঘটান জুয়েল। ১০ বছরে তা পরিণত হয়েছে মহীরুহে। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে আরও শক্তিশালী হন জুয়েল। বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেখানে মনোনয়ন দেয় না দল সেখানে জুয়েলের হাতে নৌকা ওঠার বিষয়টিকে কেন্দ্রের গ্রিন সিগনাল হিসাবে ধরে নেয় সবাই। নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আবারও মেয়র হন তিনি। এদিকে ফিরোজ-জুয়েলের এই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে আওয়ামী লীগ। চলতে থাকে দফায় দফায় সংঘর্ষ আর হামলা-পালটাহামলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে পর্যন্ত সংঘর্ষে জড়ায় দুই গ্রুপ। কোন্দলের বলি হন যুবলীগ কর্মী তাপস। এরই মধ্যে এমপি ফিরোজের সঙ্গে বিরোধ বাধে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদারের। এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার পাশাপাশি আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন শুরু করেন তিনি। মোতালেবের এই বিরোধিতায় পালে হাওয়া লাগে ফিরোজ-জুয়েল দ্বন্দ্বে। প্রকাশ্যে জুয়েল-মোতালেব যৌথভাবে কোনো কর্মসূচিতে যোগ না দিলেও সবাই ধরে নেয় গোপন সমঝোতা রয়েছে দু’জনের মধ্যে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের এমন ধারাবাহিক বিরোধিতায় কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন ফিরোজের কর্মী-সমর্থকরা।

এমপি ফিরোজের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ জুয়েল-মোতালেবের : কী কারণে এই বিভক্তি, প্রশ্ন করা হলে পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল বলেন, ‘৪০ বছরে কি বাউফলে এমন একজন তৈরি হয়নি যিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে পারেন? তিনি (এমপি ফিরোজ) হুইপ ছিলেন, চিফ হুইপ ছিলেন, ৭ বার এমপি, তার পরও যখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটা আঁকড়ে রাখেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে একক আধিপত্যের নেশায় পেয়েছে তাকে। নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে ত্যাগী পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে কমিটিতে ঢুকিয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের লোকজন। তার (ফিরোজ) বিরোধিতা মানেই আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়া। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে পর্যন্ত তার লোকজন দিয়ে কমিটি করতে হবে। অথচ যারা বংশপরম্পরায় আওয়ামী লীগ করেন, যার বাবা এমপি ছিলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তাদের রাজনীতি করতে বাধা দেন। একটাই ভয়, কেউ যদি টপকে যায়। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। যুগ যুগ ধরে এভাবে সবপর্যায়ে বিরোধিতা তৈরি হলেও নির্ভর করার মতো কেউ না থাকায় চুপ ছিল সবাই। এখন মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। সবাই তার বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাউফল উপজেলার চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘উপজেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সভাপতি ছিলাম। এখন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। কখনোই তার (এমপি ফিরোজ) বিরুদ্ধে যাইনি। অথচ হঠাৎ করেই তিনি আমাকে সাইজ করা শুরু করলেন। হয়তো ভেবেছেন ভবিষ্যতে আমি এমপি মনোনয়ন চাইব। তিনি কাউকে বিশ্বাস করেন না। যখন যাকে মনে হয় কাছে টানেন আবার ছুড়ে ফেলে দেন। এখন আবার পরিবারতন্ত্র কায়েমের মিশন নিয়েছেন। ছেলে রায়হান শাকিবকে উপজেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি করেছিলেন। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে অবশ্য শেষ পর্যন্ত মিশন সফল হয়নি। এর আগে ছেলেকে দিয়ে মনোনয়নও দাখিল করিয়েছিলেন। তিনি আসলে আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে গড়ছেন ফিরোজ লীগ। এসবের পাশাপাশি অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়গুলো তো রয়েছেই। এভাবে তো আর দল চলতে পারে না।’

যা বললেন এমপি আ.স.ম ফিরোজ : দলের দুই প্রভাবশালী নেতার এসব অভিযোগ শুরুতেই উড়িয়ে দেন এমপি ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিপর্যায়ে সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগে কোনো সমস্যা নেই। এখানে দল চলে গণতান্ত্রিক পন্থায়। আমি যখন কারও অন্যায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেই না তখনই আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ওঠে। একনায়কতন্ত্র চালালে এলাকার মানুষ আমাকে ৭ বার ভোট দিত? হাজার বিরোধিতা করেও আমার প্রতি জনগণের যে সমর্থন তা কি কেউ টলাতে পেরেছে?’ পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এমপি-মন্ত্রীর ছেলেমেয়েরা রাজনীতি করতে পারবে না, এমনকি কোনো বিধান আছে? যোগ্যতা থাকলে আমাদের সন্তানরা অবশ্যই রাজনীতি করবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমি আমার ছেলেকে কোনোরকম স্পেস দিচ্ছি কিনা সেটা। তার যোগ্যতা থাকলে-জনসমর্থন থাকলে সে অবশ্যই রাজনীতি করবে। না থাকলে করবে না, এটা নিয়ে তো কথা বলার কিছু নেই। দল এবং জনগণ আমার ওপর আস্থা রেখেছে, এটাই আমার জন্য জরুরি, কে কি বলল তাতে কিছুই আসে যায় না।’

মনোনয়ন দ্বন্দ্বে বিভক্ত বিএনপি : আওয়ামী লীগের মতো এতটা জটিল না হলেও বাউফলে বিএনপির অভ্যন্তরেও রয়েছে নানা সমস্যা। তৃণমূলে দল পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সেখানে এখন রয়েছে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। সম্প্রতি এই কমিটি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ঘোষণা করেছে নতুন কমিটির নেতাদের নাম। আর এই ঘোষণা নিয়েই প্রকাশ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। একসময় এই বাউফলে বিএনপির হাফ ডজনেরও বেশি নেতা চাইতেন দলীয় মনোনয়ন। বর্তমানে অবশ্য সংখ্যাটি নেমে এসেছে মাত্র দু’জনে। এরা হলেন-এই আসনের সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার এবং দলের কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন। এই মুনির হোসেনের বাবা আব্দুর রশিদ চুন্নু আবার পটুয়াখালী জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে বিএনপির যে নয়া কমিটি ঘোষিত হয়েছে তার বিরোধিতায় নেমেছেন শহিদুল আলম তালুকদার। অর্থের বিনিময়ে এবং নিজস্ব লোকজন দিয়ে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

যুগান্তরকে শহিদুল আলম বলেন, ‘মুনির হোসেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক। কেন্দ্রে বসে তিনি এখানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তার বাবা জেলা কমিটির আহ্বায়ক। সেই সুবাদে প্রথমেই বাউফলে আহ্বায়ক কমিটি বানিয়েছেন নিজস্ব লোকজন দিয়ে। এখন আবার চলছে ইউনিয়ন পর্যায়ে পছন্দের লোকজন বসানোর মিশন। তাতেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না যদি সম্মেলন এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে হতো। কিন্তু তারা ঢাকায় বসে ইচ্ছেমতো কমিটি বানিয়ে পাঠিয়েছে। কমিটির পদ বিক্রি নিয়ে সদস্য-সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজের সঙ্গে নেতাদের ফোনালাপের অডিও রেকর্ডও ভাইরাল হয়েছে। এসব ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রে অভিযোগ দিয়েছেন। এখন দেখি কেন্দ্রীয় নেতারা কী সিদ্ধান্ত দেন।’

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনির হোসেন বলেন, ‘যতদূর জানি সম্মেলন ও ভোটাভুটির মাধ্যমে কমিটি হয়েছে। এখানে আমার প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নই আসে না। শুধু শুধু আমাকে জড়ানো হচ্ছে। বাউফলে বিএনপি এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। নিয়মিত দলীয় কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কথা বলা মানে দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বাউফলে ইউনিয়ন কমিটি গঠন নিয়ে কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বসব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রিপোর্ট পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র।

সূত্র: যুগান্তর