রোগীর সুরক্ষায় ওষুধের সঠিক প্রয়োগ জরুরি

2
দেশেই বিশ্বমানের অনেক ওষুধ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে তার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। ওষুধ উৎপাদন থেকে বিপণনের বিভিন্ন ধাপে নষ্ট হচ্ছে এর মান। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওষুধের উচ্চমূল্য ও যত্রতত্র বিক্রি। আর সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সংখ্যাও অপ্রতুল। এসব কারণে অনিরাপদ হচ্ছে রোগীর সামগ্রিক সুরক্ষাব্যবস্থা। শনিবার বিকালে দৈনিক যুগান্তরের কনফারেন্সে কক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস-২০২২ উপলক্ষ্যে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যুগান্তর। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু। যুগান্তরের স্বাস্থ্য পাতার সম্পাদক ডা. ফাহিম আহমেদ রুপমের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন- বাংলাদেশ ক্যানসার হসপিটাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার হোমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এমএ হাই, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের (এনআইসিআরএইচ) পরিচালক অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. সিতেশ চন্দ্র বাছার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও ফার্মাকোভিজিল্যান্স বিভাগের প্রধান ড. আকতার হোসাইন। অধ্যাপক ডা. এমএ হাই বলেন, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরাপদ ওষুধ সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীকে তার সমস্যার কথাগুলো চিকিৎসককে বলতে হবে। চিকিৎসককেও রোগীর সব সমস্যা জেনে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা যাবে না। অনেককে দেখা যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে কিনে মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ সেবন করছেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে পাকস্থলীর ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এজন্য চিকিৎসকদেরও উচিত কোনো রোগীকে ওষুধ দিলে কতদিন, কতবার, কত ডোজ খাবে, কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানানো। আগে থেকে অন্য ওষুধ খাচ্ছে কিনা, তাও জেনে নিতে হবে। এজন্য চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, ফার্মাসিস্ট প্রত্যেকের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ উৎপাদনের পর বাজারজাতের আগে তদারকি করতে হবে। সব ওষুধের দোকানে পেশাজীবী ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে। সর্বোপরি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, গণমাধ্যম ও রোগীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাড়াতে হবে এই ক্ষেত্রের জনবল। চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। যাতে সব রোগীর ঢাকায় না আসতে হয়। অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করে যেতে হয়। তবুও এসব হাসপাতালের নেতিবাচক বিষয়গুলোই বেশিরভাগ সময় সামনে আসে, যা সেখানে কাজ করা মানুষকে আরও হতাশ করে দেয়। এভাবে হতে থাকলে মানুষ আস্থা হারাবে। পাশের দেশ ভারতে চিকিৎসার জন্য চলে যাবে। এতে সাধারণ মানুষ ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকৃত অর্থে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে ভালো কাজের প্রশংসা থাকতে হবে। জনবলসহ বিদ্যমান সংকট নিরসন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সি’ গ্রেডের যেসব ফার্মাসিস্টের কথা বলা হয়, তারা মূলত ওষুধ বিক্রি করে। এদের ওষুধ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। অধ্যাপক ড. সিতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, রোগীদের নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিতে যেভাবে কাজ হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। দেশে যত সংখ্যক ফার্মাকোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট থাকার কথা তা নেই। অথচ ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে রোগীদের রক্ষায় চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে ফার্মাসিস্টদেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের হেলথ কেয়ার সিস্টেম থেকে ফার্মাসিস্ট কেয়ার-সবখানে ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালগুলোয় ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। এজন্য সরকার প্রতিটি হাসপাতালে ১০টি ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট পদে নিয়োগের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে এক থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া ‘সি’ গ্রেডের ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বিপণন করছে। এতে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের অকার্যকারিতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা রোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে ভূমিকা রাখতে হবে। সব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের ফার্মাকোভিজিলেন্সের কাজ করতে হবে। সেই সঙ্গে সার্ভিলেন্সের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, রোগীর জন্য ওষুধের নিরাপত্তার তিনটি দিক রয়েছে। সেগুলো হলো-সরবরাহ থাকতে হবে, সুলভ হতে হবে এবং তা প্রয়োগে কারও ক্ষতি হবে না। এই বিষয়গুলো নিশ্চিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীনে থাকা তদারক সংস্থাগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু সেই তৎপরতায় ঘাটতি রয়েছে। ওষুধের প্রকৃত দোকানের সংখ্যা বিজিডিএ বলতে পারবে না। যাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তাদের বাইরে ৪০-৫০ হাজার দোকান রয়েছে। তারাও লাইসেন্সধারীদের মতো ওষুধ বিক্রি করছে। যেখানে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। ছাপরা দোকানেও বিক্রি হচ্ছে ওষুধ। যেখানে ওষুধ সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা নেই। অবস্থা এমন হয়েছে, মুদি দোকান আর ওষুধের দোকানের মধ্যে মানুষ পার্থক্য করতে পারছে না। গেলেই সেখানকার দোকানদার যে কোনো রোগের ওষুধ দিয়ে দিচ্ছে। এ সংকট নিরসনে তদারকি জোরদার করতে হবে। মডেল ফার্মাসিগুলো তাদের শর্ত মানছে কি না, তাও দেখতে হবে। ড. আকতার হোসাইন বলেন, রোগীকে যদি আমরা মানুষ ভাবি, নিজেদেরই রোগী মনে করি, তাহলে নতুন করে সচেতনতার প্রয়োজন হবে না। ওষুধ ও এর প্রয়োগ নিরাপদ করতে আমরা কাজ করছি। কিন্তু দেশের আর্থসামাজিকসহ বেশকিছু বিষয় মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হয়। কয়েক বছর আগেও সারা দেশে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে মাত্র ২৩ জন কর্মকর্তা ছিলেন, তখন ৪৮ দেশে ওষুধ রপ্তানি হতো। অধিদপ্তরের অনেক কাজ থাকে। ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তর থেকে অধিদপ্তর হয়েছে। বর্তমানে ১৫৭টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই কথাটি অনেকইে বুঝতে চান না। আমরা কোনো ছুটি কাটাতে পারি না। দিনরাত পরিশ্রম করি। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও হাল ছেড়ে দিইনি। আরও আশার বাণী হলো, হাসপাতালগুলো এগিয়ে আসছে। সর্বোপরি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। সাংবাদিক এহসানুল হক বাবু বলেন, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে এই খাতে জনবল বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সঠিক মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিতে কোম্পানিগুলো তাদের আউটলেট খুলতে পারে। যাতে ভালোমানের ওষুধ পেতে জনসাধারণ খুব সহজেই সঠিক জায়গা খুঁজে পেতে পারে। তাছাড়া রোগীর সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওষুধের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি জরুরি। আলোচনায় আরও অংশ নেন-সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ও মেজর জেনারেল অধ্যাপক ডা. মো. আজিজুল ইসলাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ, স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেডের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হুসেইন, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম মাহমুদুল হক পল্লব, এভারকেয়ার হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, লিভার রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লুৎফুল এল. চৌধুরী, ইউনাইটেড হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. অসীম কুমার সেন গুপ্ত ও যুগান্তরের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) আবুল খায়ের চৌধুরী। অধ্যাপক ডা. মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন তখনই হবে, যখন এক্ষেত্রের জনবলের সংখ্যার মানোন্নয়ন হবে। এটা না করা গেলে কোনোভাবেই রোগীর কষ্ট কমানো যাবে না। রোগীর নিরাপত্তায় চিকিৎসকের করণীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ওষুধ প্রয়োগে তাৎক্ষণিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। সেজন্য এগুলো প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে। রোগীর পূর্ববর্তী শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ওষুধের সঠিক ফরমুলেশন ও প্রিজারভেশন জরুরি। সেটি না হলে মান নষ্ট হবে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে। এজন্য ফার্মাসিস্ট সংখ্যাও বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুরে দেখেছি, হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্ট সংখ্যা প্রায় সমান। এ সময় ভারতে রোগী যাওয়ার প্রবণতা রোধে চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের দাম সাশ্রয়ী করার পরামর্শও দেন তিনি। অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে সরকারিগুলোর কার্যক্রম ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে সরকারিতে ভর্তি ও বহির্বিভাগের রোগীদের পৃথক পরিবেশে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেলে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে যেসব রোগী আসেন, তাদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশেরই ওষুধ কেনার সামর্থ্য থাকে না। যদিও সরকার ক্যানসার আক্রান্তদের জন্য কিছু ওষুধ দিচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। কারণ রোগীর তুলনায় ওষুধের সরবরাহ খুবই কম। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ক্যানসারের চিকিৎসায় ইনজেকটেবল ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে কেমোথেরাপির প্রত্যেক রোগীকে একটি নির্ধারিত রেটে স্যালাইনের মাধ্যমে ওষুধ শরীরে দিতে হয়, যা চিকিৎসকরা নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক-নার্সের সংখ্যা কম থাকায় ইচ্ছা থাকলেও সব সময় শতভাগ সেবা দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়। ভর্তি রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজন বা অ্যাটেনডেন্টরা ওষুধের মাত্রা সম্পর্কে বোঝে না। ফলে ওষুধ প্রয়োগে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এজন্য চিকিৎসক-নার্সদের সংকট দূর করা জরুরি। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে শিক্ষা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতালের পাশের কোনো দোকান থেকে ওষুধ আনা হচ্ছে। সেখানে কোল্ড চেইন মেনটেইন করা হয় না। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হুসেইন বলেন, দেশে বিদেশ থেকে প্রচুর মলিকিউল ও বিভিন্ন রোগের ওষুধ বাজারে আসছে। কিন্তু সেটির অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্টস (এপিআই) সোর্স আছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন। এটি কীভাবে আসে, তাপমাত্রা মেনটেইন করে আনা হয় কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিং পদ্ধতি আছে কি না-এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা এগুলো সরবরাহ করছে তারা মান নিশ্চিতের কথা বললেও বাস্তবে শতভাগ কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, অনেক সময় এমনও হয়, একটি বহুজাতিক কোম্পানি ১০ বছর গবেষণা করে একটি ওষুধ তৈরি করছে। এটি বাজারে আসার পর বাংলাদেশ সেটি দুই বছরের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা এপিআই হচ্ছে না। যা আসছে, রোগীরা তাই ব্যবহার করছে। প্রশ্ন হলো-এ ব্যপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মনিটরিংয়ে কোনো দায়িত্ব আছে কি না? কারণ এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। এসএম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, দেশে ফার্মেসি সংকট নেই। কিন্তু ওষুধের ফার্মাকোভিজিল্যান্সের দরকার আছে। আগে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অ্যাডভান্স রিয়্যাকশন নিয়ে আলোচনা হলেও এখন রোগীদের ওষুধ নিরাপত্তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে। এজন্য সরকারের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার। এক্ষেত্রে ফার্মেসিগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, ওষুধ পরিবহণে নির্দিষ্ট মান ধরে রাখতে আমরা কোল্ড চেইন নিশ্চিত করেছি। সফিস্টিকেটেড ড্রাগস রাখতে ২৫ জেলায় ২৫টি স্টোর করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জড়িতদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। আমরা দেশে ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে চাই। ডা. লুৎফুল এল চৌধুরী বলেন, একটি কোম্পানি ওষুধ তৈরির পর সেগুলো প্রতিনিধির মাধ্যমে ফার্মেসি হয়ে ফার্মাসিস্ট, চিকিৎসক, নার্স ও রোগীদের কাছে পৌঁছায়। এভারকেয়ার হাসপাতালে সামগ্রিক দেখভালের জন্য আমাদের একটি ড্রাগ কমিটি আছে। যাতে করে ভুল ওষুধের প্রয়োগ না হয়। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো ওষুধ অনুমোদন হয় না। সব ওষুধ কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে অর্ডার (ক্রয়) করা হয়। ডা. অসীম কুমার সেন গুপ্ত বলেন, একটি ওষুধ বাজারজাত করতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহণসহ অনেক কাজ রয়েছে। রোগীদের নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি। আমরা করপোরেট হাসপাতালগুলোয় এসব করতে পারি। এক্ষেত্রে ক্রস চেকিং ব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত সম্ভব।

নিউজ ডেস্ক: দেশেই বিশ্বমানের অনেক ওষুধ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে তার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। ওষুধ উৎপাদন থেকে বিপণনের বিভিন্ন ধাপে নষ্ট হচ্ছে এর মান। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওষুধের উচ্চমূল্য ও যত্রতত্র বিক্রি। আর সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সংখ্যাও অপ্রতুল। এসব কারণে অনিরাপদ হচ্ছে রোগীর সামগ্রিক সুরক্ষাব্যবস্থা।

শনিবার বিকালে দৈনিক যুগান্তরের কনফারেন্সে কক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস-২০২২ উপলক্ষ্যে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যুগান্তর।

এতে স্বাগত বক্তব্য দেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক বাবু। যুগান্তরের স্বাস্থ্য পাতার সম্পাদক ডা. ফাহিম আহমেদ রুপমের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন- বাংলাদেশ ক্যানসার হসপিটাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার হোমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এমএ হাই, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের (এনআইসিআরএইচ) পরিচালক অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. সিতেশ চন্দ্র বাছার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও ফার্মাকোভিজিল্যান্স বিভাগের প্রধান ড. আকতার হোসাইন।

অধ্যাপক ডা. এমএ হাই বলেন, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরাপদ ওষুধ সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীকে তার সমস্যার কথাগুলো চিকিৎসককে বলতে হবে। চিকিৎসককেও রোগীর সব সমস্যা জেনে নিতে হবে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা যাবে না। অনেককে দেখা যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে কিনে মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ সেবন করছেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে পাকস্থলীর ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

এজন্য চিকিৎসকদেরও উচিত কোনো রোগীকে ওষুধ দিলে কতদিন, কতবার, কত ডোজ খাবে, কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানানো। আগে থেকে অন্য ওষুধ খাচ্ছে কিনা, তাও জেনে নিতে হবে।

এজন্য চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, ফার্মাসিস্ট প্রত্যেকের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ উৎপাদনের পর বাজারজাতের আগে তদারকি করতে হবে। সব ওষুধের দোকানে পেশাজীবী ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে।

সর্বোপরি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, গণমাধ্যম ও রোগীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাড়াতে হবে এই ক্ষেত্রের জনবল। চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। যাতে সব রোগীর ঢাকায় না আসতে হয়।

অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করে যেতে হয়।

তবুও এসব হাসপাতালের নেতিবাচক বিষয়গুলোই বেশিরভাগ সময় সামনে আসে, যা সেখানে কাজ করা মানুষকে আরও হতাশ করে দেয়। এভাবে হতে থাকলে মানুষ আস্থা হারাবে।

পাশের দেশ ভারতে চিকিৎসার জন্য চলে যাবে। এতে সাধারণ মানুষ ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকৃত অর্থে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে ভালো কাজের প্রশংসা থাকতে হবে।

জনবলসহ বিদ্যমান সংকট নিরসন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সি’ গ্রেডের যেসব ফার্মাসিস্টের কথা বলা হয়, তারা মূলত ওষুধ বিক্রি করে। এদের ওষুধ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।

অধ্যাপক ড. সিতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, রোগীদের নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিতে যেভাবে কাজ হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। দেশে যত সংখ্যক ফার্মাকোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট থাকার কথা তা নেই।

অথচ ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে রোগীদের রক্ষায় চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে ফার্মাসিস্টদেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের হেলথ কেয়ার সিস্টেম থেকে ফার্মাসিস্ট কেয়ার-সবখানে ঘাটতি রয়েছে।

হাসপাতালগুলোয় ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট থাকা দরকার। এজন্য সরকার প্রতিটি হাসপাতালে ১০টি ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট পদে নিয়োগের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে এক থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া ‘সি’ গ্রেডের ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বিপণন করছে।

এতে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের অকার্যকারিতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা রোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে ভূমিকা রাখতে হবে। সব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের ফার্মাকোভিজিলেন্সের কাজ করতে হবে। সেই সঙ্গে সার্ভিলেন্সের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, রোগীর জন্য ওষুধের নিরাপত্তার তিনটি দিক রয়েছে। সেগুলো হলো-সরবরাহ থাকতে হবে, সুলভ হতে হবে এবং তা প্রয়োগে কারও ক্ষতি হবে না।

এই বিষয়গুলো নিশ্চিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীনে থাকা তদারক সংস্থাগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু সেই তৎপরতায় ঘাটতি রয়েছে। ওষুধের প্রকৃত দোকানের সংখ্যা বিজিডিএ বলতে পারবে না।

যাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তাদের বাইরে ৪০-৫০ হাজার দোকান রয়েছে। তারাও লাইসেন্সধারীদের মতো ওষুধ বিক্রি করছে। যেখানে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। ছাপরা দোকানেও বিক্রি হচ্ছে ওষুধ। যেখানে ওষুধ সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা নেই।

অবস্থা এমন হয়েছে, মুদি দোকান আর ওষুধের দোকানের মধ্যে মানুষ পার্থক্য করতে পারছে না। গেলেই সেখানকার দোকানদার যে কোনো রোগের ওষুধ দিয়ে দিচ্ছে। এ সংকট নিরসনে তদারকি জোরদার করতে হবে। মডেল ফার্মাসিগুলো তাদের শর্ত মানছে কি না, তাও দেখতে হবে।

ড. আকতার হোসাইন বলেন, রোগীকে যদি আমরা মানুষ ভাবি, নিজেদেরই রোগী মনে করি, তাহলে নতুন করে সচেতনতার প্রয়োজন হবে না। ওষুধ ও এর প্রয়োগ নিরাপদ করতে আমরা কাজ করছি।

কিন্তু দেশের আর্থসামাজিকসহ বেশকিছু বিষয় মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হয়। কয়েক বছর আগেও সারা দেশে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে মাত্র ২৩ জন কর্মকর্তা ছিলেন, তখন ৪৮ দেশে ওষুধ রপ্তানি হতো।

অধিদপ্তরের অনেক কাজ থাকে। ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তর থেকে অধিদপ্তর হয়েছে। বর্তমানে ১৫৭টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই কথাটি অনেকইে বুঝতে চান না। আমরা কোনো ছুটি কাটাতে পারি না।

দিনরাত পরিশ্রম করি। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও হাল ছেড়ে দিইনি। আরও আশার বাণী হলো, হাসপাতালগুলো এগিয়ে আসছে। সর্বোপরি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।

সাংবাদিক এহসানুল হক বাবু বলেন, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে এই খাতে জনবল বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সঠিক মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিতে কোম্পানিগুলো তাদের আউটলেট খুলতে পারে।

যাতে ভালোমানের ওষুধ পেতে জনসাধারণ খুব সহজেই সঠিক জায়গা খুঁজে পেতে পারে। তাছাড়া রোগীর সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওষুধের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি জরুরি।

আলোচনায় আরও অংশ নেন-সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ও মেজর জেনারেল অধ্যাপক ডা. মো. আজিজুল ইসলাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ, স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেডের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হুসেইন, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম মাহমুদুল হক পল্লব, এভারকেয়ার হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, লিভার রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লুৎফুল এল. চৌধুরী, ইউনাইটেড হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. অসীম কুমার সেন গুপ্ত ও যুগান্তরের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) আবুল খায়ের চৌধুরী।

অধ্যাপক ডা. মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন তখনই হবে, যখন এক্ষেত্রের জনবলের সংখ্যার মানোন্নয়ন হবে। এটা না করা গেলে কোনোভাবেই রোগীর কষ্ট কমানো যাবে না।

রোগীর নিরাপত্তায় চিকিৎসকের করণীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ওষুধ প্রয়োগে তাৎক্ষণিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। সেজন্য এগুলো প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে।

রোগীর পূর্ববর্তী শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ওষুধের সঠিক ফরমুলেশন ও প্রিজারভেশন জরুরি। সেটি না হলে মান নষ্ট হবে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।

এজন্য ফার্মাসিস্ট সংখ্যাও বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুরে দেখেছি, হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্ট সংখ্যা প্রায় সমান। এ সময় ভারতে রোগী যাওয়ার প্রবণতা রোধে চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের দাম সাশ্রয়ী করার পরামর্শও দেন তিনি।

অধ্যাপক ডা. আলিয়া শাহনাজ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে সরকারিগুলোর কার্যক্রম ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে সরকারিতে ভর্তি ও বহির্বিভাগের রোগীদের পৃথক পরিবেশে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়।

বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেলে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে যেসব রোগী আসেন, তাদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশেরই ওষুধ কেনার সামর্থ্য থাকে না। যদিও সরকার ক্যানসার আক্রান্তদের জন্য কিছু ওষুধ দিচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। কারণ রোগীর তুলনায় ওষুধের সরবরাহ খুবই কম।

তিনি বলেন, বেশির ভাগ ক্যানসারের চিকিৎসায় ইনজেকটেবল ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে কেমোথেরাপির প্রত্যেক রোগীকে একটি নির্ধারিত রেটে স্যালাইনের মাধ্যমে ওষুধ শরীরে দিতে হয়, যা চিকিৎসকরা নির্ধারণ করে দেন।

কিন্তু হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক-নার্সের সংখ্যা কম থাকায় ইচ্ছা থাকলেও সব সময় শতভাগ সেবা দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়। ভর্তি রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজন বা অ্যাটেনডেন্টরা ওষুধের মাত্রা সম্পর্কে বোঝে না।

ফলে ওষুধ প্রয়োগে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এজন্য চিকিৎসক-নার্সদের সংকট দূর করা জরুরি। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে শিক্ষা দরকার।

অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতালের পাশের কোনো দোকান থেকে ওষুধ আনা হচ্ছে। সেখানে কোল্ড চেইন মেনটেইন করা হয় না। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হুসেইন বলেন, দেশে বিদেশ থেকে প্রচুর মলিকিউল ও বিভিন্ন রোগের ওষুধ বাজারে আসছে। কিন্তু সেটির অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্টস (এপিআই) সোর্স আছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন।

এটি কীভাবে আসে, তাপমাত্রা মেনটেইন করে আনা হয় কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিং পদ্ধতি আছে কি না-এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা এগুলো সরবরাহ করছে তারা মান নিশ্চিতের কথা বললেও বাস্তবে শতভাগ কার্যকারিতা পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, অনেক সময় এমনও হয়, একটি বহুজাতিক কোম্পানি ১০ বছর গবেষণা করে একটি ওষুধ তৈরি করছে। এটি বাজারে আসার পর বাংলাদেশ সেটি দুই বছরের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা এপিআই হচ্ছে না। যা আসছে, রোগীরা তাই ব্যবহার করছে। প্রশ্ন হলো-এ ব্যপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মনিটরিংয়ে কোনো দায়িত্ব আছে কি না? কারণ এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত।

এসএম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, দেশে ফার্মেসি সংকট নেই। কিন্তু ওষুধের ফার্মাকোভিজিল্যান্সের দরকার আছে। আগে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অ্যাডভান্স রিয়্যাকশন নিয়ে আলোচনা হলেও এখন রোগীদের ওষুধ নিরাপত্তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে।

এজন্য সরকারের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার। এক্ষেত্রে ফার্মেসিগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, ওষুধ পরিবহণে নির্দিষ্ট মান ধরে রাখতে আমরা কোল্ড চেইন নিশ্চিত করেছি।

সফিস্টিকেটেড ড্রাগস রাখতে ২৫ জেলায় ২৫টি স্টোর করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জড়িতদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। আমরা দেশে ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে চাই।

ডা. লুৎফুল এল চৌধুরী বলেন, একটি কোম্পানি ওষুধ তৈরির পর সেগুলো প্রতিনিধির মাধ্যমে ফার্মেসি হয়ে ফার্মাসিস্ট, চিকিৎসক, নার্স ও রোগীদের কাছে পৌঁছায়। এভারকেয়ার হাসপাতালে সামগ্রিক দেখভালের জন্য আমাদের একটি ড্রাগ কমিটি আছে।

যাতে করে ভুল ওষুধের প্রয়োগ না হয়। এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো ওষুধ অনুমোদন হয় না। সব ওষুধ কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে অর্ডার (ক্রয়) করা হয়।

ডা. অসীম কুমার সেন গুপ্ত বলেন, একটি ওষুধ বাজারজাত করতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহণসহ অনেক কাজ রয়েছে। রোগীদের নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি।

আমরা করপোরেট হাসপাতালগুলোয় এসব করতে পারি। এক্ষেত্রে ক্রস চেকিং ব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত সম্ভব।

সূত্র: যুগান্তর