শিক্ষার খরচে ত্রাহি দশা

2
ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউটের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। থাকেন বকশিবাজার এলাকায়। ক্লাস শেষে দুটো টিউশনি করেন। এই আয়ে নিজের লেখাপড়াসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটান তিনি। আগস্ট থেকে তার একটি টিউশনি বন্ধ হয়ে গেছে। ২৫ জুলাই হঠাৎ করে তাকে বলা হয়, আগস্ট থেকে তারা আর গৃহশিক্ষক রাখতে পারছেন না। কারণ তাদের পক্ষে গৃহশিক্ষকের ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। অবস্থার উন্নতি হলে ফের ডাকবেন। জান্নাতুল যুগান্তরকে বলেন, তিনি চকবাজার এলাকার ওই বাসায় গিয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। তাকে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা দেওয়া হতো। দুই টিউশনি থেকে তিনি নয় হাজার টাকা পেতেন। এই টাকায় নিজের প্রতিদিনের খরচসহ কলেজের ব্যয় মেটাতেন। গত পৌনে ২ মাসেও তিনি নতুন কোনো টিউশনির খোঁজ পাননি। টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলে রেখেও লাভ হয়নি। তিনি আরও জানান, তার ছাত্রীদের বাবা চকবাজারে একটি ব্যবসা করতেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জান্নাতুলের মতো ঢাকায় এমন আরও অনেক ভুক্তভোগী আছেন। এরা সাধারণত টিউশনি বা কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে শিক্ষাব্যয়সহ নিজের প্রতিদিনের খরচ চালিয়ে থাকেন। এদের বেশিরভাগই ঢাকার কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থী। এছাড়া বেকার ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জীবন নির্বাহের মাধ্যম টিউশনি। কিন্তু তা পর্যায়ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ বাসভাড়া, বাড়ি ভাড়া, গ্যাস বিল এমনকি শিক্ষাসামগ্রীর দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। এ কারণে যে যেখানে পারছেন আয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যয় সংকোচন করছেন। আর এটা করতে গিয়ে অনেকেই গৃহশিক্ষক ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কোচিং সেন্টার থেকে বাচ্চা তুলে নিচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষার বিভিন্ন সামগ্রীর দামও বাড়ছে হু হু করে। এমনকি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, টিউশনসহ অন্যান্য খরচও বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের সামনে অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে খাতা, কাগজ, কলম, পেন্সিলসহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম অনেক বেড়েছে। অনেকেই সন্তানকে স্কুলের টিফিনের জন্য বেকারি আইটেম কিনে দেন। সেগুলোর কোনো কোনোটির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বেড়েছে রিকশাসহ যানবাহনের ভাড়া। ইতোমধ্যে এসব ব্যয় মেটাতে তাদের নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ জিনিসপত্রের মতো শিক্ষা উপকরণসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি কাম্য নয়। তিনি বলেন, বাস্তব কারণে ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে হয়তো সেটা সহ্যসীমায় থাকতে পারে। কিন্তু শতভাগ কিংবা দ্বিগুণ বা তিনগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হলে তা ভয়ানক অপরাধ হিসাবে গণ্য হওয়া উচিত। এ ধরনের কর্মের জন্য অসাধু ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলো সক্রিয় হলে শিক্ষা উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সঙ্গেও যুগান্তরের কথা হয়। তিনি বলেন, শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে অল্প আয়ের পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার মেয়েদের মতো ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণে আরোপিত সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স এক বছরের জন্য প্রত্যাহার করা হলে দাম অনেকটাই কমে আসবে। রাজধানীর নীলক্ষেতে সরেজমিন কয়েকটি স্টেশনারি দোকান ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় সব খাতার দাম বেড়েছে। অনেকে সন্তানকে কাগজ কিনে খাতা বানিয়ে দেন। কিন্তু নিউজপ্রিন্ট আর হোয়াইট-সব কাগজের দামই বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। ছোট রুল টানা যে খাতার দাম আগে ছিল ১৫ টাকা, এখন ২০ থেকে ২৫ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। ২৫ টাকার খাতা এখন বিক্রি হয় ৪০ টাকা। ৮০ টাকার বড় খাতা ১২০-১৩০ টাকায় নিতে হচ্ছে। ৪৬ টাকার পেন্সিল বক্স বিক্রি হয় ৮০ টাকা। ৮০ টাকার জ্যামিতি বক্স ১৩০ টাকা। ২৬০ টাকার সাদা কাগজ এখন বিক্রি হয় ৪৮০ টাকা রিম। এছাড়া বিভিন্ন প্র্যাকটিকাল খাতার দাম প্রতি পিসে ৭০-৮০ টাকা বেড়েছে। বেড়েছে কলম, পেন্সিল, স্কুলের পোশাক, স্কুলব্যাগ, পেন্সিল ব্যাগ, স্কেল, রাবার, শার্পনার, মার্কার, ফাইল, ক্যালকুলেটর, ক্লিপবোর্ড ইত্যাদির দাম। অভিভাবকরা বলছেন, উল্লিখিত শিক্ষাসামগ্রী ছাত্রছাত্রীদের জন্য অপরিহার্য। এসব খাতের ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ নেই। জীবন নির্বাহের বাড়তি খরচের পাশাপাশি শিক্ষায় বর্ধিত ব্যয়ের চাপে দিশেহারা তারা। তাই কম গুরুত্বপূর্ণ ভেবে অনেক অভিভাবক টিউটরের পেছনে খরচ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। ক্লাসরুমে বেশিরভাগ শিক্ষক পড়া নেন আর পৃষ্ঠা দেখিয়ে দেন। পড়াটা বাসায়ই তৈরি করতে হয়। তবু বাধ্য হয়ে এই ব্যয় কমাতে হচ্ছে তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় কামরুল ইসলাম নামের এক অভিভাবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার কন্যা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বাসায় গিয়ে পড়াতেন। গত ২ মাস ধরে তিনি প্রাইভেট টিউটরকে না করে দিয়েছেন। এখন তার স্ত্রী মেয়ের লেখাপড়া দেখছেন। আরেক অভিভাবক রাজ বলেন, টিউটর বাদ না দিয়ে উপায় নেই। অন্যান্য পণ্যের মতো খাতা, কাগজ, কলম-পেন্সিল, রাবারসহ শিক্ষার সব ধরনের সামগ্রীর দাম বেড়েছে। রিকশা ভাড়া ১৫ দিন আগে যেখানে ৩০-৪০ টাকা ছিল এখন ৫০ টাকা দিতে হয়। এ অবস্থায় শিক্ষাসামগ্রী শিক্ষাজীবন থেকে কেটে ফেলা সম্ভব নয়। সম্ভব শুধু হাউজ টিউটর বাদ দেওয়া আর সন্তানকে রিকশায় না তুলে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা। তিনি তাই করছেন। জানা গেছে, দাম বৃদ্ধির তালিকায় আছে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বই। ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স (ওয়াকার) নিউজপ্রিন্ট পেপার ১০০ টাকা বেড়েছে। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স নিউজপ্রিন্ট বইয়ের দাম প্রতি পিসে ১০০ টাকা বেড়েছে। ইনট্রোডাকশন টু নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ১০০ টাকা বেড়েছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির দাম আগের চেয়ে বেশি। আর্টিফিশিয়াল হাড়ের দাম ৩০০ টাকা বেড়েছে। নতুন কংকাল দুই বছর আগে ২৫-২৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন ৩-৪ হাজার টাকা বেড়েছে। আর পুরোনো কংকালের দাম ৩৪ হাজার থেকে বেড়ে ৩৬ হাজার টাকা হয়েছে। ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিনের দাম প্রতিটিতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেড়েছে। স্টেথোস্কোপের দাম ২০০ টাকা বেড়েছে। বায়োলজি বক্স ৫০ টাকা করে বেড়েছে। এভাবে কাঁচি, টেপ, টর্চলাইট, হাতুড়ির দাম বেড়েছে। বেড়েছে মেডিকেল শিক্ষার সব ধরনের বইয়ের দাম। বিপরীত দিকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার ব্যয় বেড়েছে অনেক। ২০১২ সালে যেখানে ভর্তি খরচ ছিল ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, এখন তা বেড়ে ১৮-২০ লাখ টাকা হয়েছে। আর টিউশন ফি বেড়েছে বহুগুণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচও বেড়েছে। যেমন-আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই ও ট্রিপল-ই বিভাগে কোর্স ফি বিগত ৫ বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে। অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট প্রতি চার্জ ২০১৯ সালে যেখানে সাড়ে ৫ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে তা সাড়ে ৬ হাজার টাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। মাহদী হাসান নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র জানান, শুধু টিউশন ফি আর হল চার্জ কর্তৃপক্ষ বাড়াতে পারে। কিন্তু আর সব খাতেই তো ব্যয় বেড়েছে। এভাবে স্কুলগুলোতেও চার্জ বেড়েছে বলে জানা গেছে। ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি ঢাকায় প্রচুর একাডেমিক কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। ‘ছায়া শিক্ষা’ নামে পরিচিত এই সেবার সঙ্গে জড়িতরা জানিয়েছেন, তাদের ছাত্রছাত্রীও কমছে। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য কোচিং সেন্টার উন্মেষের একজন উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান সোহাগ জানান, বর্তমানে অভিভাবকরা সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন। আর ঢাকায় সচেতন অভিভাবকের হার আরও বেশি। কিন্তু এরপরও দেখা যাচ্ছে, গত মাসের তুলনায় এ মাসে ১০-১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কমে গেছে, যারা লেখাপড়া করত। মোহাম্মদপুর এলাকার আরেক বিখ্যাত কোচিং সেন্টার পাঠশালা। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী পলাশ সরকার যুগান্তরকে বলেন, গত ২ মাসে তাদের শিক্ষার্থী ২০-৩০ শতাংশ কমে গেছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয় হওয়ায় কেউই প্রকৃত কারণ জানাতে চান না। এরপরও কয়েকজন বলেছেন, ব্যয় তুলনামূলক দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আয়ের সঙ্গে তাদের ব্যয়ের সঙ্গতি হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই সন্তানকে কোচিং থেকে তুলে নিচ্ছেন।

নিউজ ডেস্ক: ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউটের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। থাকেন বকশিবাজার এলাকায়। ক্লাস শেষে দুটো টিউশনি করেন। এই আয়ে নিজের লেখাপড়াসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটান তিনি। আগস্ট থেকে তার একটি টিউশনি বন্ধ হয়ে গেছে।

২৫ জুলাই হঠাৎ করে তাকে বলা হয়, আগস্ট থেকে তারা আর গৃহশিক্ষক রাখতে পারছেন না। কারণ তাদের পক্ষে গৃহশিক্ষকের ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। অবস্থার উন্নতি হলে ফের ডাকবেন।

জান্নাতুল যুগান্তরকে বলেন, তিনি চকবাজার এলাকার ওই বাসায় গিয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। তাকে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা দেওয়া হতো। দুই টিউশনি থেকে তিনি নয় হাজার টাকা পেতেন। এই টাকায় নিজের প্রতিদিনের খরচসহ কলেজের ব্যয় মেটাতেন। গত পৌনে ২ মাসেও তিনি নতুন কোনো টিউশনির খোঁজ পাননি। টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলে রেখেও লাভ হয়নি। তিনি আরও জানান, তার ছাত্রীদের বাবা চকবাজারে একটি ব্যবসা করতেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জান্নাতুলের মতো ঢাকায় এমন আরও অনেক ভুক্তভোগী আছেন। এরা সাধারণত টিউশনি বা কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে শিক্ষাব্যয়সহ নিজের প্রতিদিনের খরচ চালিয়ে থাকেন। এদের বেশিরভাগই ঢাকার কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থী। এছাড়া বেকার ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জীবন নির্বাহের মাধ্যম টিউশনি। কিন্তু তা পর্যায়ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ বাসভাড়া, বাড়ি ভাড়া, গ্যাস বিল এমনকি শিক্ষাসামগ্রীর দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। এ কারণে যে যেখানে পারছেন আয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যয় সংকোচন করছেন। আর এটা করতে গিয়ে অনেকেই গৃহশিক্ষক ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কোচিং সেন্টার থেকে বাচ্চা তুলে নিচ্ছেন।

এছাড়া শিক্ষার বিভিন্ন সামগ্রীর দামও বাড়ছে হু হু করে। এমনকি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, টিউশনসহ অন্যান্য খরচও বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের সামনে অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে খাতা, কাগজ, কলম, পেন্সিলসহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম অনেক বেড়েছে। অনেকেই সন্তানকে স্কুলের টিফিনের জন্য বেকারি আইটেম কিনে দেন। সেগুলোর কোনো কোনোটির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বেড়েছে রিকশাসহ যানবাহনের ভাড়া। ইতোমধ্যে এসব ব্যয় মেটাতে তাদের নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা হয়েছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ জিনিসপত্রের মতো শিক্ষা উপকরণসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি কাম্য নয়।

তিনি বলেন, বাস্তব কারণে ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে হয়তো সেটা সহ্যসীমায় থাকতে পারে। কিন্তু শতভাগ কিংবা দ্বিগুণ বা তিনগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হলে তা ভয়ানক অপরাধ হিসাবে গণ্য হওয়া উচিত। এ ধরনের কর্মের জন্য অসাধু ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলো সক্রিয় হলে শিক্ষা উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সঙ্গেও যুগান্তরের কথা হয়। তিনি বলেন, শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে অল্প আয়ের পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার মেয়েদের মতো ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণে আরোপিত সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স এক বছরের জন্য প্রত্যাহার করা হলে দাম অনেকটাই কমে আসবে।

রাজধানীর নীলক্ষেতে সরেজমিন কয়েকটি স্টেশনারি দোকান ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় সব খাতার দাম বেড়েছে। অনেকে সন্তানকে কাগজ কিনে খাতা বানিয়ে দেন। কিন্তু নিউজপ্রিন্ট আর হোয়াইট-সব কাগজের দামই বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। ছোট রুল টানা যে খাতার দাম আগে ছিল ১৫ টাকা, এখন ২০ থেকে ২৫ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। ২৫ টাকার খাতা এখন বিক্রি হয় ৪০ টাকা। ৮০ টাকার বড় খাতা ১২০-১৩০ টাকায় নিতে হচ্ছে। ৪৬ টাকার পেন্সিল বক্স বিক্রি হয় ৮০ টাকা। ৮০ টাকার জ্যামিতি বক্স ১৩০ টাকা। ২৬০ টাকার সাদা কাগজ এখন বিক্রি হয় ৪৮০ টাকা রিম। এছাড়া বিভিন্ন প্র্যাকটিকাল খাতার দাম প্রতি পিসে ৭০-৮০ টাকা বেড়েছে। বেড়েছে কলম, পেন্সিল, স্কুলের পোশাক, স্কুলব্যাগ, পেন্সিল ব্যাগ, স্কেল, রাবার, শার্পনার, মার্কার, ফাইল, ক্যালকুলেটর, ক্লিপবোর্ড ইত্যাদির দাম।

অভিভাবকরা বলছেন, উল্লিখিত শিক্ষাসামগ্রী ছাত্রছাত্রীদের জন্য অপরিহার্য। এসব খাতের ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ নেই। জীবন নির্বাহের বাড়তি খরচের পাশাপাশি শিক্ষায় বর্ধিত ব্যয়ের চাপে দিশেহারা তারা। তাই কম গুরুত্বপূর্ণ ভেবে অনেক অভিভাবক টিউটরের পেছনে খরচ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। ক্লাসরুমে বেশিরভাগ শিক্ষক পড়া নেন আর পৃষ্ঠা দেখিয়ে দেন। পড়াটা বাসায়ই তৈরি করতে হয়। তবু বাধ্য হয়ে এই ব্যয় কমাতে হচ্ছে তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় কামরুল ইসলাম নামের এক অভিভাবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার কন্যা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বাসায় গিয়ে পড়াতেন। গত ২ মাস ধরে তিনি প্রাইভেট টিউটরকে না করে দিয়েছেন। এখন তার স্ত্রী মেয়ের লেখাপড়া দেখছেন।

আরেক অভিভাবক রাজ বলেন, টিউটর বাদ না দিয়ে উপায় নেই। অন্যান্য পণ্যের মতো খাতা, কাগজ, কলম-পেন্সিল, রাবারসহ শিক্ষার সব ধরনের সামগ্রীর দাম বেড়েছে। রিকশা ভাড়া ১৫ দিন আগে যেখানে ৩০-৪০ টাকা ছিল এখন ৫০ টাকা দিতে হয়। এ অবস্থায় শিক্ষাসামগ্রী শিক্ষাজীবন থেকে কেটে ফেলা সম্ভব নয়। সম্ভব শুধু হাউজ টিউটর বাদ দেওয়া আর সন্তানকে রিকশায় না তুলে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা। তিনি তাই করছেন।

জানা গেছে, দাম বৃদ্ধির তালিকায় আছে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বই। ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স (ওয়াকার) নিউজপ্রিন্ট পেপার ১০০ টাকা বেড়েছে। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স নিউজপ্রিন্ট বইয়ের দাম প্রতি পিসে ১০০ টাকা বেড়েছে। ইনট্রোডাকশন টু নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ১০০ টাকা বেড়েছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির দাম আগের চেয়ে বেশি। আর্টিফিশিয়াল হাড়ের দাম ৩০০ টাকা বেড়েছে। নতুন কংকাল দুই বছর আগে ২৫-২৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন ৩-৪ হাজার টাকা বেড়েছে। আর পুরোনো কংকালের দাম ৩৪ হাজার থেকে বেড়ে ৩৬ হাজার টাকা হয়েছে। ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিনের দাম প্রতিটিতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেড়েছে। স্টেথোস্কোপের দাম ২০০ টাকা বেড়েছে। বায়োলজি বক্স ৫০ টাকা করে বেড়েছে। এভাবে কাঁচি, টেপ, টর্চলাইট, হাতুড়ির দাম বেড়েছে। বেড়েছে মেডিকেল শিক্ষার সব ধরনের বইয়ের দাম।

বিপরীত দিকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার ব্যয় বেড়েছে অনেক। ২০১২ সালে যেখানে ভর্তি খরচ ছিল ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, এখন তা বেড়ে ১৮-২০ লাখ টাকা হয়েছে। আর টিউশন ফি বেড়েছে বহুগুণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচও বেড়েছে। যেমন-আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই ও ট্রিপল-ই বিভাগে কোর্স ফি বিগত ৫ বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে। অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট প্রতি চার্জ ২০১৯ সালে যেখানে সাড়ে ৫ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে তা সাড়ে ৬ হাজার টাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। মাহদী হাসান নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র জানান, শুধু টিউশন ফি আর হল চার্জ কর্তৃপক্ষ বাড়াতে পারে। কিন্তু আর সব খাতেই তো ব্যয় বেড়েছে। এভাবে স্কুলগুলোতেও চার্জ বেড়েছে বলে জানা গেছে।

ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি ঢাকায় প্রচুর একাডেমিক কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। ‘ছায়া শিক্ষা’ নামে পরিচিত এই সেবার সঙ্গে জড়িতরা জানিয়েছেন, তাদের ছাত্রছাত্রীও কমছে।

দেশের অন্যতম স্বনামধন্য কোচিং সেন্টার উন্মেষের একজন উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান সোহাগ জানান, বর্তমানে অভিভাবকরা সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন। আর ঢাকায় সচেতন অভিভাবকের হার আরও বেশি। কিন্তু এরপরও দেখা যাচ্ছে, গত মাসের তুলনায় এ মাসে ১০-১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কমে গেছে, যারা লেখাপড়া করত।

মোহাম্মদপুর এলাকার আরেক বিখ্যাত কোচিং সেন্টার পাঠশালা। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী পলাশ সরকার যুগান্তরকে বলেন, গত ২ মাসে তাদের শিক্ষার্থী ২০-৩০ শতাংশ কমে গেছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয় হওয়ায় কেউই প্রকৃত কারণ জানাতে চান না। এরপরও কয়েকজন বলেছেন, ব্যয় তুলনামূলক দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আয়ের সঙ্গে তাদের ব্যয়ের সঙ্গতি হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই সন্তানকে কোচিং থেকে তুলে নিচ্ছেন।

সূত্র: যুগান্তর