গাজী মাজহারের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

0
ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় গানগুলোর বেশিরভাগই সৃষ্টি করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এই গীতিকবি সুর আর শব্দের দ্যোতনায় মোহমুগ্ধ করে রেখেছিলেন কয়েক প্রজন্মের মানুষকে। রোববার তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)। কিন্তু তার সৃষ্টি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে’-বহুকাল ভেসে রবে সুরেরও গগনে, হৃদয়ের গহিনে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক। স্ত্রী জোহরা গাজী, ছেলে সরফরাজ আনোয়ার উপল ও মেয়ে দিঠি আনোয়ারকে রেখে গেছেন তিনি। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার তালেশ্বর গ্রামে। শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ষাটের দশকে ছাত্র থাকাকালে প্রথম গান ‘বুঝেছি মনের বনে রঙ লেগেছে’ লিখেন। নাজমুল হুদা বাচ্চুর সুরে সেই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন। ১৯৬৪ সালে গাজী মাজহারুল আনোয়ার রেডিও পাকিস্তানের জন্য গান লেখা শুরু করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে তিনি নিয়মিত গান ও নাটক লিখতেন। ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্রের অঙ্গনে ডাক পড়ে তার। মাত্র ১০ মিনিটে তিনি লিখেছিলেন ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’। এই গান দিয়েই সিনেমায় গীতিকার হিসাবে কাজ শুরু করেন। সত্য সাহার সুরে ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ ছবিতে গানটি গেয়েছিলেন আঞ্জুমান আরা বেগম। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় সুভাষ দত্ত পরিচালিত ছবিটি। গানটি আজও খুবই জনপ্রিয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লার গাওয়া প্রথম গান ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে’ মাজহারুল আনোয়ারেরই লেখা। ১৯৭০ সালে ‘জয় বাংলা’ (পরে ‘সংঘাত’) সিনেমার জন্য তিনি রচনা করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা জাগানো গান ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। আনোয়ার পারভেজের সুরে এই গানকেই পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। ষাটের দশক থেকে দেশের এমন কেনো গুণী সংগীতশিল্পী নেই, যার কণ্ঠে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গান গীত হয়নি। সৈয়দ আব্দুল হাদী, মাহমুদুন্নবী, আঞ্জুমান আরা বেগম, রথীন্দ্রনাথ রায়, বশির আহমেদ, খুরশিদ আলম, অ্যান্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা থেকে শুরু করে এই প্রজন্মের অনেক শিল্পীও গেয়েছেন তার গান। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’ আর ‘একবার যেতে দে না’-এই তিনটি গান বিবিসির এক জরিপে ২০ শতকের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নেয়। তার লেখা গানের মধ্যে রয়েছে-‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনেরও আয়নাতে’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘ও পাখি তোর যন্ত্রণা আর তো প্রাণে সয় না’, ‘ইশারায় শীষ দিয়ে আমাকে ডেকো না’, ‘চোখের নজর এমনি কইরা একদিন ক্ষইয়া যাবে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘সে যে কেন এলো না, কিছু ভালো লাগে না’, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে তুমি কেন কোমরের বিছা হইলা না’, ‘তুমি আরেকবার আসিয়া যাও মোরে কান্দাইয়া’, ‘সাতটি রঙের মাঝে মিল খুঁজে না পাই’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘চলে আমার সাইকেল’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’। ১৯৬৭ সালের পর চলচ্চিত্রে কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায়ও ব্যস্ত হন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নান্টু ঘটক’ ১৯৮২ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত ও প্রযোজিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ‘শাস্তি’, ‘স্বাধীন’, ‘শর্ত’, ‘সমর’, ‘ক্ষুধা’, ‘তপস্যা’, ‘উল্কা’, ‘পরাধীন’, ‘পাষাণের প্রেম’, ‘জীবনের গল্প’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘জিঞ্জির’, ‘আনারকলি’ ও ‘বিচারপতি’। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ২০০২ সালে একুশে পদক এবং গত বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি। ১৯৭২ সালে তিনি পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক। গাজী মাজহারুল আনোয়ার চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্য, সেন্সর বোর্ড সদস্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

নিউজ ডেস্ক: ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় গানগুলোর বেশিরভাগই সৃষ্টি করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এই গীতিকবি সুর আর শব্দের দ্যোতনায় মোহমুগ্ধ করে রেখেছিলেন কয়েক প্রজন্মের মানুষকে।

রোববার তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে (ইন্না লিল্লাহি … রাজিউন)। কিন্তু তার সৃষ্টি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে’-বহুকাল ভেসে রবে সুরেরও গগনে, হৃদয়ের গহিনে।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক। স্ত্রী জোহরা গাজী, ছেলে সরফরাজ আনোয়ার উপল ও মেয়ে দিঠি আনোয়ারকে রেখে গেছেন তিনি।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার তালেশ্বর গ্রামে। শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ষাটের দশকে ছাত্র থাকাকালে প্রথম গান ‘বুঝেছি মনের বনে রঙ লেগেছে’ লিখেন। নাজমুল হুদা বাচ্চুর সুরে সেই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন। ১৯৬৪ সালে গাজী মাজহারুল আনোয়ার রেডিও পাকিস্তানের জন্য গান লেখা শুরু করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে তিনি নিয়মিত গান ও নাটক লিখতেন।

১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্রের অঙ্গনে ডাক পড়ে তার। মাত্র ১০ মিনিটে তিনি লিখেছিলেন ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’। এই গান দিয়েই সিনেমায় গীতিকার হিসাবে কাজ শুরু করেন। সত্য সাহার সুরে ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ ছবিতে গানটি গেয়েছিলেন আঞ্জুমান আরা বেগম। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় সুভাষ দত্ত পরিচালিত ছবিটি। গানটি আজও খুবই জনপ্রিয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লার গাওয়া প্রথম গান ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে’ মাজহারুল আনোয়ারেরই লেখা। ১৯৭০ সালে ‘জয় বাংলা’ (পরে ‘সংঘাত’) সিনেমার জন্য তিনি রচনা করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা জাগানো গান ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’।

আনোয়ার পারভেজের সুরে এই গানকেই পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসাবে বেছে নেওয়া হয়।

ষাটের দশক থেকে দেশের এমন কেনো গুণী সংগীতশিল্পী নেই, যার কণ্ঠে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গান গীত হয়নি। সৈয়দ আব্দুল হাদী, মাহমুদুন্নবী, আঞ্জুমান আরা বেগম, রথীন্দ্রনাথ রায়, বশির আহমেদ, খুরশিদ আলম, অ্যান্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা থেকে শুরু করে এই প্রজন্মের অনেক শিল্পীও গেয়েছেন তার গান।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’ আর ‘একবার যেতে দে না’-এই তিনটি গান বিবিসির এক জরিপে ২০ শতকের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নেয়। তার লেখা গানের মধ্যে রয়েছে-‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনেরও আয়নাতে’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘ও পাখি তোর যন্ত্রণা আর তো প্রাণে সয় না’, ‘ইশারায় শীষ দিয়ে আমাকে ডেকো না’, ‘চোখের নজর এমনি কইরা একদিন ক্ষইয়া যাবে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘সে যে কেন এলো না, কিছু ভালো লাগে না’, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে তুমি কেন কোমরের বিছা হইলা না’, ‘তুমি আরেকবার আসিয়া যাও মোরে কান্দাইয়া’, ‘সাতটি রঙের মাঝে মিল খুঁজে না পাই’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘চলে আমার সাইকেল’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’।

১৯৬৭ সালের পর চলচ্চিত্রে কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায়ও ব্যস্ত হন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নান্টু ঘটক’ ১৯৮২ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত ও প্রযোজিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ‘শাস্তি’, ‘স্বাধীন’, ‘শর্ত’, ‘সমর’, ‘ক্ষুধা’, ‘তপস্যা’, ‘উল্কা’, ‘পরাধীন’, ‘পাষাণের প্রেম’, ‘জীবনের গল্প’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘জিঞ্জির’, ‘আনারকলি’ ও ‘বিচারপতি’। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ২০০২ সালে একুশে পদক এবং গত বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি। ১৯৭২ সালে তিনি পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্য, সেন্সর বোর্ড সদস্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

সূত্র: যুগান্তর