নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস

5
করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট সংকটে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় একরকম হাঁসফাঁস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি। এ সময় বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুতের দামও। সেখান থেকে পরিত্রাণের আগেই নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ, যা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এর প্রভাবে আরেক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। আর গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রাও আরও চরমে উঠেছে। পাশাপাশি নতুন করে সকাল ও বিকালের নাশতা তৈরির উপকরণের দাম আরেক দফা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। ফলে আয় না বাড়লেও সব শ্রেণির মানুষের ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পরিবার। এদিকে গত বছর থেকে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। পাশাপাশি বেড়েছে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়। বেড়েছে বাড়ি ভাড়াও। ফলে জীবনযাপনে সব খাতেই নিজ থেকেই একরকম ‘রেশনিং’ করতে বাধ্য হচ্ছে প্রায় সব শ্রেণির মানুষ। চাহিদা থাকলেও ব্যয় কমাতে পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে বাজেট কাটছাঁট করছেন অনেকেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ চালাচ্ছে। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম অসহনীয় হয়ে উঠছে। একাধিক পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গণপরিবহণের ভাড়া বেড়েছে। এতে মানুষের সার্বিক ব্যয় আরেক দফা বাড়ছে। ফলে সব শ্রেণির মানুষ দুর্ভোগে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। তাদের নাভিশ্বাস বাড়ছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। সোমবার রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, রামপুরা বাজার, মালিবাগ এবং ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে প্রতি কেজি চালের দাম ৫ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি আটা ময়দায় ৪ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৫ টাকা, চিনি ৩ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি সবজি সর্বোচ্চ ২০ টাকা বেড়েছে। আর মাছ কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ টাকা। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হয়েছে ৪৬ টাকা, যা দুদিন আগে ৪২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি খোলা ময়দা বিক্রি হয়েছে ৬২ টাকা, যা আগে ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে চিনি বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৭৫ টাকা, যা আগে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চার টাকা বেড়ে প্রতি হালি (চার পিস) ফার্মের ডিম বিক্রি হয়েছে ৪৪ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি রুইমাছ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগে ৩১০ টাকা ছিল। ১০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি পাঙাশ ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৭০-৭২ টাকা, যা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে ৬৬-৬৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি বেগুন ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগে ৬০ টাকা ছিল। ঢেঁড়শ ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও সোমবার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া শসা বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। এছাড়া খুচরা বাজারে বিআর ২৮ জাতের চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৫৫ টাকায়, যা তেলের দাম বাড়ার আগে ৫০ টাকা ছিল। এ ছাড়া মোটা জাতের চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা, যা আগে ৪৬ টাকা ছিল। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগে প্রতি কেজি পটোল ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও সোমবার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাঁচ টাকা বেড়ে এক কেজি পেঁপে বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে চিচিঙা, ধুন্দল, কাঁকরোল বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকায়। প্রতি কেজি করলা বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা, যা আগে ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রাজধানীর নয়াবাজারে পণ্য কিনতে আসা মো. জাহিদুল বলেন, এমনিতেই বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব। ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে ৩৫ হাজার টাকা পাই। এ দিয়ে সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলে নিত্যপণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই কম পরিমাণে পণ্য কিনতে হচ্ছে। খেতেও হচ্ছে কম। আগে তিন বেলা খাবারের সঙ্গে সন্ধ্যা ও সকালে ভালো আয়োজন করা হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ায় সবকিছু বেসামাল হয়ে উঠেছে। তাই আগের কিছু টাকা সঞ্চয় করলেও এখন করা যাচ্ছে না। বরং আগের কিছু সঞ্চয় করা টাকা ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। কাওরান বাজারে সবজি কিনতে এসেছেন ভ্যানচালক আব্দুল মিয়া। তিনি বলেন, কী খেয়ে বাঁচব, তা নিয়ে এখন চিন্তা করতে হচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সবজির দাম অনেক বেড়েছে। সরকার একেক সময় একেক জিনিসের দাম বাড়ায়, যার ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু আমাদের আয় বাড়ে না। আজ ৪৬০ টাকার কাজ করতে পেরেছি। এ দিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচসহ পরিবারের ৬ সদস্যের খাবার নিতে হবে। কী দিয়ে কী করব, কিছুই জানি না। সবকিছু চিন্তা করতে দম বন্ধ হয়ে আসছে। দাম বাড়ার কারণ হিসাবে কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। আগে উত্তরাঞ্চল থেকে ট্রাকে ১৬ হাজার টাকায় সবজি আনা যেত। তেলের দাম বাড়ায় ১৯-২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ট্রাকপ্রতি ৩ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। তাই সবজির দাম বেড়েছে। কাওরান বাজারের মদিনা রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাক আনতে ২৪ হাজার টাকা খরচ পড়ত। এখন তেলের দাম বাড়ায় ২৯ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে এই বাড়তি টাকা চালের দামে প্রভাব পড়েছে। তাই পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে বেড়েছে। জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, গত বছর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ার কারণে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। ওই সময় কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে বেকারি পণ্যের দাম বেড়েছে। তখন পরিবহণের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম আবারও চড়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে সব শ্রেণির ভোক্তা বিড়ম্বনায় পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেশি বেড়েছে। এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এখন তেলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিলে রিজার্ভ একদম কমে যাবে। এতে দেশ হুমকির মুখে পড়ে যাবে। এর চেয়ে বরং এখনই কিছুটা কষ্ট করে আমরা সাবধান হই। আমরা একটু সাশ্রয় করি, একটু কম খাই। তিনি জানান, সরকার ইচ্ছা করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে তেলের দাম বেড়েছে। তাই দেশের তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে যাতে অসাধুরা পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখা হচ্ছে। পণ্যের দাম যাতে যৌক্তিক থাকে সেজন্য তদারকি করা হচ্ছে। কেউ পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি করলে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। ডেমরা (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, রাজধানীর ডেমরায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের দাম। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তেল, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে। সরেজমিন, ডেমরার সারুলিয়া, বামৈল, কোনাপাড়া, বাঁশেরপুল, বড়ভাঙ্গা ও হাজীনগরসহ কয়েকটি অস্থায়ী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে পণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। বাজারগুলোতে চালের দাম ইতোমধ্যে প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। নাজিরশাইল চাল ইতোমধ্যে ৭৫-৮০ টাকা হয়েছে, যা সামনে আরও বাড়বে। সারুলিয়া বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শামিম আহম্মেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারে প্রতিদিনই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ পেয়ে আমরা তদারকি করছি। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহণে ভাড়া বৃদ্ধির দায় দিয়ে সব পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। যাত্রাবাড়ী (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বাজারে চাল, আটা, চিনি, কাঁচামরিচ, সুকনা মরিচ, বিভিন্ন মসলা, মাছ, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। যাত্রাবাড়ী এলাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চাষের কই মাছ আগে ছিল ১৫০ টাকা, সোমবার ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, চাষের শিং মাছ আগে ছিল ২৫০ টাকা, এ দিন বিক্রি হয়েছে ৩৫০ টাকা কেজি। উত্তর যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি চালের আড়তের মালিক সফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কুষ্টিয়া দেশ এগ্রো মিল থেকে চাল আনা হয়। সেখানকার ট্রাক ভাড়া ছিল ১৭ হাজার টাকা। বর্তমানে ওই স্থানের ভাড়া ২১ হাজার টাকা। এ জন্য চালের দাম বাড়তি। তুরাগ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে সাধারণ মানুষ। বাড়িওয়ালা থেকে ভাড়াটিয়া কেউই রেহাই পাচ্ছে না। বাজারে সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খেটে-খাওয়া মানুষ ভিড় করছে এলাকার ওএমএসের দোকানগুলোতে। এসব দোকান থেকে শুধু চাল ও আটা কিনতে পারলেও মাছ, মাংস, শাকসবজিসহ সংসারের বাজার তালিকার অন্য সবকিছুই বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে বাজার করতে এসে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নিউজ ডেস্ক: করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট সংকটে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় একরকম হাঁসফাঁস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি। এ সময় বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুতের দামও।

সেখান থেকে পরিত্রাণের আগেই নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ, যা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এর প্রভাবে আরেক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম।

আর গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রাও আরও চরমে উঠেছে। পাশাপাশি নতুন করে সকাল ও বিকালের নাশতা তৈরির উপকরণের দাম আরেক দফা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। ফলে আয় না বাড়লেও সব শ্রেণির মানুষের ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পরিবার।

এদিকে গত বছর থেকে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। পাশাপাশি বেড়েছে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়। বেড়েছে বাড়ি ভাড়াও। ফলে জীবনযাপনে সব খাতেই নিজ থেকেই একরকম ‘রেশনিং’ করতে বাধ্য হচ্ছে প্রায় সব শ্রেণির মানুষ।

চাহিদা থাকলেও ব্যয় কমাতে পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে বাজেট কাটছাঁট করছেন অনেকেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ চালাচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম অসহনীয় হয়ে উঠছে।

একাধিক পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গণপরিবহণের ভাড়া বেড়েছে। এতে মানুষের সার্বিক ব্যয় আরেক দফা বাড়ছে। ফলে সব শ্রেণির মানুষ দুর্ভোগে পড়তে শুরু করেছে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। তাদের নাভিশ্বাস বাড়ছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। সোমবার রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, রামপুরা বাজার, মালিবাগ এবং ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে প্রতি কেজি চালের দাম ৫ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি আটা ময়দায় ৪ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৫ টাকা, চিনি ৩ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি সবজি সর্বোচ্চ ২০ টাকা বেড়েছে। আর মাছ কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ টাকা।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হয়েছে ৪৬ টাকা, যা দুদিন আগে ৪২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি খোলা ময়দা বিক্রি হয়েছে ৬২ টাকা, যা আগে ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে চিনি বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৭৫ টাকা, যা আগে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চার টাকা বেড়ে প্রতি হালি (চার পিস) ফার্মের ডিম বিক্রি হয়েছে ৪৪ টাকা।

বাজারে প্রতি কেজি রুইমাছ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগে ৩১০ টাকা ছিল। ১০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি পাঙাশ ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৭০-৭২ টাকা, যা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে ৬৬-৬৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

প্রতি কেজি বেগুন ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগে ৬০ টাকা ছিল। ঢেঁড়শ ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও সোমবার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া শসা বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা।

এছাড়া খুচরা বাজারে বিআর ২৮ জাতের চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৫৫ টাকায়, যা তেলের দাম বাড়ার আগে ৫০ টাকা ছিল। এ ছাড়া মোটা জাতের চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা, যা আগে ৪৬ টাকা ছিল।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগে প্রতি কেজি পটোল ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও সোমবার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাঁচ টাকা বেড়ে এক কেজি পেঁপে বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে চিচিঙা, ধুন্দল, কাঁকরোল বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকায়।

প্রতি কেজি করলা বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা, যা আগে ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রাজধানীর নয়াবাজারে পণ্য কিনতে আসা মো. জাহিদুল বলেন, এমনিতেই বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব। ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে ৩৫ হাজার টাকা পাই।

এ দিয়ে সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলে নিত্যপণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই কম পরিমাণে পণ্য কিনতে হচ্ছে। খেতেও হচ্ছে কম।

আগে তিন বেলা খাবারের সঙ্গে সন্ধ্যা ও সকালে ভালো আয়োজন করা হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ায় সবকিছু বেসামাল হয়ে উঠেছে। তাই আগের কিছু টাকা সঞ্চয় করলেও এখন করা যাচ্ছে না। বরং আগের কিছু সঞ্চয় করা টাকা ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে।

কাওরান বাজারে সবজি কিনতে এসেছেন ভ্যানচালক আব্দুল মিয়া। তিনি বলেন, কী খেয়ে বাঁচব, তা নিয়ে এখন চিন্তা করতে হচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সবজির দাম অনেক বেড়েছে।

সরকার একেক সময় একেক জিনিসের দাম বাড়ায়, যার ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু আমাদের আয় বাড়ে না। আজ ৪৬০ টাকার কাজ করতে পেরেছি। এ দিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচসহ পরিবারের ৬ সদস্যের খাবার নিতে হবে। কী দিয়ে কী করব, কিছুই জানি না। সবকিছু চিন্তা করতে দম বন্ধ হয়ে আসছে।

দাম বাড়ার কারণ হিসাবে কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। আগে উত্তরাঞ্চল থেকে ট্রাকে ১৬ হাজার টাকায় সবজি আনা যেত। তেলের দাম বাড়ায় ১৯-২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ট্রাকপ্রতি ৩ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। তাই সবজির দাম বেড়েছে।

কাওরান বাজারের মদিনা রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাক আনতে ২৪ হাজার টাকা খরচ পড়ত। এখন তেলের দাম বাড়ায় ২৯ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে এই বাড়তি টাকা চালের দামে প্রভাব পড়েছে। তাই পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে বেড়েছে।

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, গত বছর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ার কারণে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।

ওই সময় কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে বেকারি পণ্যের দাম বেড়েছে। তখন পরিবহণের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম আবারও চড়া হচ্ছে।

ইতোমধ্যে বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে সব শ্রেণির ভোক্তা বিড়ম্বনায় পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেশি বেড়েছে। এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এখন তেলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিলে রিজার্ভ একদম কমে যাবে।

এতে দেশ হুমকির মুখে পড়ে যাবে। এর চেয়ে বরং এখনই কিছুটা কষ্ট করে আমরা সাবধান হই। আমরা একটু সাশ্রয় করি, একটু কম খাই। তিনি জানান, সরকার ইচ্ছা করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে তেলের দাম বেড়েছে। তাই দেশের তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে যাতে অসাধুরা পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখা হচ্ছে। পণ্যের দাম যাতে যৌক্তিক থাকে সেজন্য তদারকি করা হচ্ছে। কেউ পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি করলে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

ডেমরা (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, রাজধানীর ডেমরায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের দাম। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তেল, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে।

সরেজমিন, ডেমরার সারুলিয়া, বামৈল, কোনাপাড়া, বাঁশেরপুল, বড়ভাঙ্গা ও হাজীনগরসহ কয়েকটি অস্থায়ী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে পণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। বাজারগুলোতে চালের দাম ইতোমধ্যে প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নাজিরশাইল চাল ইতোমধ্যে ৭৫-৮০ টাকা হয়েছে, যা সামনে আরও বাড়বে। সারুলিয়া বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শামিম আহম্মেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারে প্রতিদিনই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ পেয়ে আমরা তদারকি করছি।

তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহণে ভাড়া বৃদ্ধির দায় দিয়ে সব পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। যাত্রাবাড়ী (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।

বাজারে চাল, আটা, চিনি, কাঁচামরিচ, সুকনা মরিচ, বিভিন্ন মসলা, মাছ, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। যাত্রাবাড়ী এলাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চাষের কই মাছ আগে ছিল ১৫০ টাকা, সোমবার ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, চাষের শিং মাছ আগে ছিল ২৫০ টাকা, এ দিন বিক্রি হয়েছে ৩৫০ টাকা কেজি।

উত্তর যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি চালের আড়তের মালিক সফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কুষ্টিয়া দেশ এগ্রো মিল থেকে চাল আনা হয়। সেখানকার ট্রাক ভাড়া ছিল ১৭ হাজার টাকা। বর্তমানে ওই স্থানের ভাড়া ২১ হাজার টাকা।

এ জন্য চালের দাম বাড়তি। তুরাগ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে সাধারণ মানুষ। বাড়িওয়ালা থেকে ভাড়াটিয়া কেউই রেহাই পাচ্ছে না।

বাজারে সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খেটে-খাওয়া মানুষ ভিড় করছে এলাকার ওএমএসের দোকানগুলোতে। এসব দোকান থেকে শুধু চাল ও আটা কিনতে পারলেও মাছ, মাংস, শাকসবজিসহ সংসারের বাজার তালিকার অন্য সবকিছুই বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে বাজার করতে এসে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সূত্র: যুগান্তর