ভোক্তার বাড়তি ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা

6
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বছরে ভোক্তার অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ২১ হাজার ৪৭৪ কোটি, অকটেন ব্যবহারকারীদের ১ হাজার ৬১০ কোটি, পেট্রোল ব্যবহারকারীদের ১ হাজার ৮৪৮ কোটি এবং কেরোসিন ব্যবহারকারীদের ৩৭৮ কোটি টাকা। যেসব ভোক্তা জ্বালানি তেল সরাসরি ব্যবহার করেন, তাদের প্রত্যক্ষ ব্যয় ওইভাবে বাড়বে। এর বাইরে জ্বালানি তেলের প্রভাবে পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ায় এর চেয়ে আরও বেশি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে ভোক্তার পকেট থেকে। এ ব্যাপারে কোনো সমীক্ষা না থাকায় এর পরিমাণ বের করা সম্ভব হচ্ছে না। সূত্র জানায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শিল্প, কৃষি, সেবা, গণপরিবহণসহ সব খাতেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। বছরে প্রায় ৬৩ লাখ টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবহার হয় যোগাযোগ খাতে। গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণেই সবচেয়ে বেশি ডিজেল লাগে। যোগাযোগ খাতে লাগে ৪০ লাখ টন। কৃষিতে ৯ লাখ ৮০ হাজার টন, এর মধ্যে সেচ কাজে লাগে ২ লাখ ৬০ হাজার টন। শিল্পে সাড়ে ৪ লাখ টন। বিদ্যুতে সাড়ে ৬ লাখ টন। গৃহস্থালিতে ১ লাখ টন এবং অন্যান্য খাতে ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল লাগে। দাম বাড়ানোর আগে ৮০ টাকা লিটার ধরে ওই ডিজেল ব্যবহারে বছরে খরচ পড়ত গড়ে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। দাম বাড়ানোর পর এখন প্রতি লিটার কিনতে হবে ১১৪ টাকা করে। ফলে ওই ডিজেল ব্যবহারে খরচ হবে ৭২ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে, চরাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও বেশি দামে ডিজেল বিক্রি হয়। এসব কারণে ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে খরচ বাড়বে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যবহারকারী ভোক্তার পকেট থেকেই সরাসরি যাবে। এসব ডিজেল ব্যবহার করে যেসব পণ্য উৎপাদন ও সেবা দেওয়া হবে, সেগুলোর দামও বাড়বে। ফলে ভোক্তার পকেট থেকে আরও টাকা যাবে। যেমন ডিজেল ব্যবহার করে শিল্পপণ্য উৎপাদন হয়। ওইসব পণ্য বিপণনে ট্রাক বা নৌপথ ব্যবহার করতে হয়। দুই খাতেই ডিজেলের ব্যবহার আছে। ফলে এসব পণ্যের দামও বাড়বে। এতেও ভোক্তার পকেট থেকে আরও বেশি অতিরিক্ত টাকা যাবে। অকটেনের ব্যবহার হয় গড়ে সাড়ে ৩ লাখ টন। প্রতি লিটার অকটেন আগে কিনতে হতো ৮৯ টাকা লিটার। এতে ব্যবহারকারীদের খরচ পড়ত ৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১৩৫ টাকা লিটার। এতে খরচ হবে ৪ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এ খাতের ব্যবহারকারীদের বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। পেট্রোলের ব্যবহার হয় গড়ে ৪ লাখ ২০ হাজার টন। আগে প্রতি লিটার কিনতে হতো ৮৬ টাকা লিটার। এতে খরচ হতো ৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১৩০ টাকা লিটার। এতে খরচ পড়বে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এতে বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। কেরোসিনে ব্যবহার হয় ১ লাখ ১০ হাজার টন। প্রতি লিটার আগে কিনতে হতো ৮০ টাকা করে। এতে মোট খরচ হতো ৮৮০ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১১৪ টাকা লিটার। এতে মোট খরচ পড়বে ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এতে বাড়তি খরচ হবে ৩৭৪ কোটি টাকা। অথচ জ্বালানি তেলে দিনদিন জনগণের ব্যয় বাড়লেও সরকারের মুনাফা কমছে না। ট্যাক্স-ভ্যাট ও প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ থেকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। বিপিসির লভ্যাংশ থেকে ৭ বছরে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এছাড়া এক লিটার ডিজেল থেকেই সরকার ১৯ থেকে ২০ টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসাবে আদায় করে। বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৮-৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ট্যাক্স-ভ্যাট হিসাবে গত ৭ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বিপিসি। ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না বলে জানিয়েছেন ক্যাবের শামসুল আলম। তিনি বলেন, লোকসানের কথা বলে দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ট্যাক্স-ভ্যাটের নামে টাকা কেটে রাখছে। দাম বাড়ায় সরকারের আয় আরও বাড়বে। অর্থনীতির সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিল জনগণের কথা ভেবে ট্যাক্স-ভ্যাটে ছাড় দেওয়া। চাহিদার শতভাগ পেট্রোল ও অকটেনের ৪০ ভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। অকটেনের অন্যতম বড় গ্রাহক প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি। মূলত তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিই চাহিদার অর্ধেক অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করে। তারা দেশীয় গ্যাস ফিল্ড থেকে কম দামে কনডেনসেট এনে রিফাইন করে অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করে। একই সঙ্গে অকটেন পেট্রোলের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। অথচ হঠাৎ করে এই বেসরকারি রিফাইনারি মালিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এক লাফে লিটারপ্রতি ৪৬ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়। দেশে উৎপাদিত অকটেনের মান বাড়াতে আমদানি করা বুস্টার মেশানো হয়। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে এ দুই পণ্যেরও দাম ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, দেশে উৎপন্ন পণ্য পেট্রোলের দাম বাড়ানো এক ধরনের প্রতারণার শামিল। অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিপিসির হিসাব ও অডিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিলেও তা কাজে আসেনি। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগ বিপিসিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও লাভ হয়নি। সংস্থাটি তাদের মতোই চলছে। তিনি বলেন, বিপিসিতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এতে স্বচ্ছতা নেই। লোকসানের অস্বচ্ছ হিসাব দেখিয়ে হুট করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় বিপিসি। আইন অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করার কথা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। কিন্তু বিপিসি কখনোই কমিশনের আওতায় আসেনি। ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। হিসাবে স্বচ্ছতা নেই বলেই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সামনে শুনানিতে অংশ নিতে ভয় পায়। শিল্প মালিকরা বলেছেন, তারা শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজেল ব্যবহার করে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিচালনা করছেন। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুতের ১১.৭৩ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে। প্রায় ১৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সারা দেশের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো। এর মধ্যে প্রায় ৯শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ডিজেলের মাধ্যমে। বাকিগুলো চলে গ্যাসে। কিন্তু হঠাৎ করে এই ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের জ্বালানি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। এই অবস্থায় শিল্পোৎপাদনে ধস নামবে বলে মনে করছেন শিল্পকারখানার মালিকরা। এতে শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাবে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষি খাতে খরচ বাড়বে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহণেও খরচ বাড়বে। সেচ কাজে বছরে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়। এ খাতে আগে কৃষকদের মোট খরচ হতো ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা। দাম বাড়ার কারণে এখন খরচ হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। খরচ বাড়বে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে শিল্পের সব খাতে খরচ বাড়বে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বাড়বে পণ্য পরিবহণ খাতে। কেননা জ্বালানির দাম বাড়ানোয় পরিবহণ খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে ১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া হবে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। কারখানায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন করতে হয়। এতেও খরচ বাড়বে অর্ধেকের বেশি। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো গেলেও রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়ানো কঠিন। কেননা প্রতিযোগী দেশগুলোয় পণ্যের উৎপাদন খরচ এত বাড়ছে না। ফলে রপ্তানি খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল উল্লেখ করে তারা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মতো অতি-জনসম্পৃক্ত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ে ছাড় দিতে পারত সরকার। ৮ বছরে তেল বিক্রি করে বিপিসি যে লাভ করেছে, তা এই আপৎকালে ব্যবহার করলে জনগণের ঘাড়ে দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপত না। দেশে উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেনের দাম বৃদ্ধিরও যৌক্তিকতা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, বিপিসির আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা জ্বালানি খাতের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতি ডেকে এনেছে। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কায় এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম পড়তির দিকে। তাই এ মুহূর্তে দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অন্যায্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক এমএম আকাশ যুগান্তরকে বলেন, যেভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে কোনো ধরনের নিয়মকানুন ও ছক মানা হয়নি। এভাবে নির্বাহী আদেশ দিয়ে তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গত কয়েক বছরে বিপিসি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এর বড় অংশ সরকার নিয়ে গেছে। এই অর্থ দিয়ে তহবিল গঠন করলে সংকট মুহূর্তে কাজে লাগানো যেত। এতে জনগণের ওপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপাতে হতো না। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও এখন কমে আসছে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণগুলো বলছে, আগামী মাসগুলোয় দাম আরও কমবে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদা কমে যেতে পারে। বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছে বিপিসি। ৮ বছরে ৪৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লাভ করে বিপিসি। আর চলতি অর্থবছরের ৮ মে পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী সংস্থার।

নিউজ ডেস্ক: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বছরে ভোক্তার অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ২১ হাজার ৪৭৪ কোটি, অকটেন ব্যবহারকারীদের ১ হাজার ৬১০ কোটি, পেট্রোল ব্যবহারকারীদের ১ হাজার ৮৪৮ কোটি এবং কেরোসিন ব্যবহারকারীদের ৩৭৮ কোটি টাকা।

যেসব ভোক্তা জ্বালানি তেল সরাসরি ব্যবহার করেন, তাদের প্রত্যক্ষ ব্যয় ওইভাবে বাড়বে। এর বাইরে জ্বালানি তেলের প্রভাবে পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ায় এর চেয়ে আরও বেশি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে ভোক্তার পকেট থেকে। এ ব্যাপারে কোনো সমীক্ষা না থাকায় এর পরিমাণ বের করা সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শিল্প, কৃষি, সেবা, গণপরিবহণসহ সব খাতেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। বছরে প্রায় ৬৩ লাখ টন ডিজেল ব্যবহার হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবহার হয় যোগাযোগ খাতে।

গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণেই সবচেয়ে বেশি ডিজেল লাগে। যোগাযোগ খাতে লাগে ৪০ লাখ টন। কৃষিতে ৯ লাখ ৮০ হাজার টন, এর মধ্যে সেচ কাজে লাগে ২ লাখ ৬০ হাজার টন। শিল্পে সাড়ে ৪ লাখ টন। বিদ্যুতে সাড়ে ৬ লাখ টন। গৃহস্থালিতে ১ লাখ টন এবং অন্যান্য খাতে ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল লাগে।

দাম বাড়ানোর আগে ৮০ টাকা লিটার ধরে ওই ডিজেল ব্যবহারে বছরে খরচ পড়ত গড়ে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। দাম বাড়ানোর পর এখন প্রতি লিটার কিনতে হবে ১১৪ টাকা করে। ফলে ওই ডিজেল ব্যবহারে খরচ হবে ৭২ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে, চরাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও বেশি দামে ডিজেল বিক্রি হয়। এসব কারণে ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে খরচ বাড়বে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যবহারকারী ভোক্তার পকেট থেকেই সরাসরি যাবে।

এসব ডিজেল ব্যবহার করে যেসব পণ্য উৎপাদন ও সেবা দেওয়া হবে, সেগুলোর দামও বাড়বে। ফলে ভোক্তার পকেট থেকে আরও টাকা যাবে। যেমন ডিজেল ব্যবহার করে শিল্পপণ্য উৎপাদন হয়। ওইসব পণ্য বিপণনে ট্রাক বা নৌপথ ব্যবহার করতে হয়।

দুই খাতেই ডিজেলের ব্যবহার আছে। ফলে এসব পণ্যের দামও বাড়বে। এতেও ভোক্তার পকেট থেকে আরও বেশি অতিরিক্ত টাকা যাবে। অকটেনের ব্যবহার হয় গড়ে সাড়ে ৩ লাখ টন। প্রতি লিটার অকটেন আগে কিনতে হতো ৮৯ টাকা লিটার।

এতে ব্যবহারকারীদের খরচ পড়ত ৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১৩৫ টাকা লিটার। এতে খরচ হবে ৪ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এ খাতের ব্যবহারকারীদের বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

পেট্রোলের ব্যবহার হয় গড়ে ৪ লাখ ২০ হাজার টন। আগে প্রতি লিটার কিনতে হতো ৮৬ টাকা লিটার। এতে খরচ হতো ৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১৩০ টাকা লিটার। এতে খরচ পড়বে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।

এতে বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। কেরোসিনে ব্যবহার হয় ১ লাখ ১০ হাজার টন। প্রতি লিটার আগে কিনতে হতো ৮০ টাকা করে। এতে মোট খরচ হতো ৮৮০ কোটি টাকা। এখন কিনতে হবে ১১৪ টাকা লিটার। এতে মোট খরচ পড়বে ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এতে বাড়তি খরচ হবে ৩৭৪ কোটি টাকা।

অথচ জ্বালানি তেলে দিনদিন জনগণের ব্যয় বাড়লেও সরকারের মুনাফা কমছে না। ট্যাক্স-ভ্যাট ও প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ থেকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। বিপিসির লভ্যাংশ থেকে ৭ বছরে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে।

এছাড়া এক লিটার ডিজেল থেকেই সরকার ১৯ থেকে ২০ টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসাবে আদায় করে। বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৮-৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ট্যাক্স-ভ্যাট হিসাবে গত ৭ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বিপিসি।

ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না বলে জানিয়েছেন ক্যাবের শামসুল আলম। তিনি বলেন, লোকসানের কথা বলে দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ট্যাক্স-ভ্যাটের নামে টাকা কেটে রাখছে। দাম বাড়ায় সরকারের আয় আরও বাড়বে। অর্থনীতির সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিল জনগণের কথা ভেবে ট্যাক্স-ভ্যাটে ছাড় দেওয়া।

চাহিদার শতভাগ পেট্রোল ও অকটেনের ৪০ ভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। অকটেনের অন্যতম বড় গ্রাহক প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি। মূলত তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিই চাহিদার অর্ধেক অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করে।

তারা দেশীয় গ্যাস ফিল্ড থেকে কম দামে কনডেনসেট এনে রিফাইন করে অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করে। একই সঙ্গে অকটেন পেট্রোলের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

অথচ হঠাৎ করে এই বেসরকারি রিফাইনারি মালিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এক লাফে লিটারপ্রতি ৪৬ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়।

দেশে উৎপাদিত অকটেনের মান বাড়াতে আমদানি করা বুস্টার মেশানো হয়। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে এ দুই পণ্যেরও দাম ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, দেশে উৎপন্ন পণ্য পেট্রোলের দাম বাড়ানো এক ধরনের প্রতারণার শামিল।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিপিসির হিসাব ও অডিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো।

বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিলেও তা কাজে আসেনি। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগ বিপিসিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও লাভ হয়নি। সংস্থাটি তাদের মতোই চলছে।

তিনি বলেন, বিপিসিতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এতে স্বচ্ছতা নেই। লোকসানের অস্বচ্ছ হিসাব দেখিয়ে হুট করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় বিপিসি। আইন অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করার কথা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের।

কিন্তু বিপিসি কখনোই কমিশনের আওতায় আসেনি। ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। হিসাবে স্বচ্ছতা নেই বলেই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সামনে শুনানিতে অংশ নিতে ভয় পায়।

শিল্প মালিকরা বলেছেন, তারা শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজেল ব্যবহার করে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিচালনা করছেন। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুতের ১১.৭৩ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে।

প্রায় ১৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সারা দেশের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো। এর মধ্যে প্রায় ৯শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ডিজেলের মাধ্যমে। বাকিগুলো চলে গ্যাসে।

কিন্তু হঠাৎ করে এই ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের জ্বালানি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। এই অবস্থায় শিল্পোৎপাদনে ধস নামবে বলে মনে করছেন শিল্পকারখানার মালিকরা।

এতে শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাবে।

ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষি খাতে খরচ বাড়বে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহণেও খরচ বাড়বে। সেচ কাজে বছরে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়।

এ খাতে আগে কৃষকদের মোট খরচ হতো ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা। দাম বাড়ার কারণে এখন খরচ হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। খরচ বাড়বে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে শিল্পের সব খাতে খরচ বাড়বে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বাড়বে পণ্য পরিবহণ খাতে।

কেননা জ্বালানির দাম বাড়ানোয় পরিবহণ খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে ১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া হবে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। কারখানায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন করতে হয়।

এতেও খরচ বাড়বে অর্ধেকের বেশি। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো গেলেও রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়ানো কঠিন।

কেননা প্রতিযোগী দেশগুলোয় পণ্যের উৎপাদন খরচ এত বাড়ছে না। ফলে রপ্তানি খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল উল্লেখ করে তারা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির মতো অতি-জনসম্পৃক্ত পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ে ছাড় দিতে পারত সরকার।

৮ বছরে তেল বিক্রি করে বিপিসি যে লাভ করেছে, তা এই আপৎকালে ব্যবহার করলে জনগণের ঘাড়ে দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপত না।

দেশে উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেনের দাম বৃদ্ধিরও যৌক্তিকতা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, বিপিসির আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতা জ্বালানি খাতের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতি ডেকে এনেছে।

বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কায় এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম পড়তির দিকে। তাই এ মুহূর্তে দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অন্যায্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক এমএম আকাশ যুগান্তরকে বলেন, যেভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে কোনো ধরনের নিয়মকানুন ও ছক মানা হয়নি। এভাবে নির্বাহী আদেশ দিয়ে তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গত কয়েক বছরে বিপিসি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এর বড় অংশ সরকার নিয়ে গেছে। এই অর্থ দিয়ে তহবিল গঠন করলে সংকট মুহূর্তে কাজে লাগানো যেত।

এতে জনগণের ওপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপাতে হতো না। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও এখন কমে আসছে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণগুলো বলছে, আগামী মাসগুলোয় দাম আরও কমবে।

কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদা কমে যেতে পারে। বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছে বিপিসি।

৮ বছরে ৪৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লাভ করে বিপিসি। আর চলতি অর্থবছরের ৮ মে পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী সংস্থার।

সূত্র: যুগান্তর