এভারেস্টের সবচেয়ে দুর্গম পথ কাংশুং ফেস

1

শায়লা বিথী: পর্বতারোহন সম্পর্কে যারা মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন তারা প্রায় সবাই এভারেস্টের নর্থ ফেস ও সাউথ ফেস সম্পর্কে জানেন। কিন্তু এভারেস্টের ইস্ট ফেস বা কাংশুং (Kangshung face) সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষেরই কোনো ধারণা নেই। এ নিয়ে লেখালেখিও খুবই কম।

কাংশুং ফেস বা ইস্ট ফেস হলো এভারেস্টের পূর্বমুখী দিক যা তিব্বতে অবস্থিত। মূলত এভারেস্ট এবং লোতসে পর্বতের পূর্ব দিক কাংশুং ফেস হিসেবে পরিচিত। কাংশুং ফেস দিয়ে প্রবাহিত কাংশুং হিমবাহ(গ্লেসিয়ার) এভারেস্টের প্রধান তিনটি হিমবাহের মধ্যে একটি। বাকি দুইটি হচ্ছে খুম্বু হিমবাহ যা সাউথ সাইড বা নেপাল সাইড দিয়ে প্রবাহিত ও রম্বুক হিমবাহ যা নর্থ সাইড বা তিব্বত সাইড দিয়ে প্রবাহিত। কাংশুং হিমবাহই পরবর্তীতে কামাচূ নদী নামে কামা ভ্যালির উপর দিয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

কাংশুং ফেস বেশ প্রসস্থ। কাংশুং গ্লেসিয়ারের উপর থেকে এভারেস্ট চূড়ার উচ্চতা ৩৩৫০মিটার বা ১১০০০ ফিট। নিচ থেকে দেখলে ডান দিকের উপরে এভারেস্টের নর্থ-ইস্ট রিজ ও বাম দিকে সাউথ-ইস্ট রিজ ও সাউথ কোল দেখা যায়। এই ফেসের উপরের দিকটা হ্যাংগিং গ্লেসিয়ার দিয়ে গঠিত। আর নিচের দিকটা খাড়া অসমতল পাথুরে পথ। ফলে সাউথ সাইড ও নর্থ সাইডের তুলনায় কাংশুং ফেস দিয়ে আরোহন করা অনেক কঠিন ও বিপদজনক।

কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট আরোহন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এদিক দিয়ে খুবই কম অভিযান পরিচালিত হয়। এদিক দিয়ে এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কিছু অভিযান হয়েছে। সাফল্য এসেছে আরো কম।

১৯২১ সালে বৃটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি ও গাই বুললক  প্রথমবারের মতো এই পথে এভারেস্ট আরোহনের জন্য দালাই লামার কাছ থেকে অনুমতি পান। তারা স্থানীয় ইয়াক পালকদের সঙ্গে নিয়ে ল্যাংমা লা ও কামা চু এর রডোডেন্ড্রন বন পেড়োতে সক্ষম হন। তবে এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছাতে পারেননি। ১৯৮০ সালে তরুণ আমেরিকান পর্বতারোহী আন্ডি হার্ভার্ড কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট অভিযানে যান। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত চূড়ায় পৌঁছাতে পারেননি।

১৯৮১ সালে আমেরিকান একটি টিম  রিচার্ড ব্লুম এবং লুই রিচার্ডের নেতৃত্বে এডমন্ড হিলারি, জর্জ লো, জন রোসকেলে, ডেভিড ব্রেশিয়ার্স এবং কিম মোম্ব  কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট অভিযানে যান। তারা পাথুরে খাড়া পথ বেয়ে এভারেস্টের প্রায় ৭০০০ মিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু এভালাঞ্জ বা তুষার ঝড়ের ঝুঁকিতে অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করে তারা ফিরতে বাধ্য হন।
কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছানোর স্বপ্ন সত্যি হয়ে ধরা দেয় ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে। আমেরিকান পর্বতারোহী  জেমস ডি মরিসির নেতৃত্বে একটি দল এই পথ দিয়ে সফলভাবে এভারেস্ট চূড়ায় আরোহন করেন। অভিযান দলের জেমস ডি মরিসি, কিম মোম্ব, কার্লোস বুহলার এবং লুই রিচার্ড ৮ অক্টোবর এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছান। একই দলের জর্জ লো, ড্যান রেড এবং জে ক্যালেস ৯ অক্টোবর চূড়ায় আরোহন করেন।

কাংশুং ফেস দিয়ে ২য় সফল অভিযান হয় ১৯৯২ সালে।  চিলির একটি দল এই অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেন। সেই দলে ছিল রদ্রিগো জর্দান, ক্রিস্টিয়ানো গার্সিয়া এবং হুয়ান সেবাস্তিয়ান মন্টেস। প্রথম নারী হিসেবে কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে সক্ষম হন একজন ভারতীয়। এই পর্বতারোহীর নাম সান্তোষ ইয়াদোব। পরবর্তীতে তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় খেতাব পদ্মশ্রী লাভ করেন।

কাংশুং ফেস দিয়ে এভারেস্ট  অভিযানে বিস্ময়কর একটি ঘটনা ঘটে ২০০৬ সালে। অস্ট্রেলিয়ার  বিখ্যাত পর্বতারোহী  লিংকন হল এভারেস্ট চূড়া  থেকে নামার পথে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। এভারেস্টের ৮৭০০মি উচ্চতা থেকে নামার সময় তিনি উচ্চতা জনিত সিকনেস সেরেব্রাল এডিমায় আক্রান্ত হন। যার কারণে তার হেলুসিনেশন হচ্ছিল ও পথ বিভ্রান্তিতে পড়েন। হলের সঙ্গী শেরপা প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে তাকে রেসকিউ করার চেষ্টা করেন। এদিকে শেরপার সঙ্গে থাকা অক্সিজেনও শেষ হয়ে আসছিল। উপায়ান্তর না দেখে অভিযান দলের নেতা আলেক্সান্ডার আব্রামোভ মৃতপ্রায় হলকে রেখেই পুরো দলকে নিচে নেমে আসার নির্দেশ দেন। অভিযান দল ক্যাম্পে ফিরে আসার পর হলকে মৃত ঘোষণা করে। হলের পরিবারকেও জানানো হয় সে খবর। পরের দিন সকালে একই পথে এভারেস্ট চূড়া থেকে ফিরছিল একটি দল। ওই দলটি হলকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পায়।

ওই দলের একজন অসবর্নি সে ঘটনার বর্ণনা করেন এভাবে, ‘আমাদের বাম পাশে একজন মানুষকে দেখতে পাই যিনি কি না ১০০০০ ফিট ফ্রি ফলিং এরিয়া থেকে মাত্র ২ ফিট দূরে। মৃত না, ঘুমন্ত না, বরফের উপর বসে পরনের কাপড় পরিবর্তন করছিল। তার ডাউনজ্যাকেট কোমর পর্যন্ত খোলা ছিল। টুপি, গ্লোভস, সানগ্লাস, অক্সিজেন মাস্ক, রেগুলেটর, আইস এক্স, অক্সিজেন, স্লিপিং ব্যাগ, ম্যাট্রেস, খাবার বা পানীয় কিছুই ছিল না। হঠাৎ লিংকন হল বলে উঠল- তোমরা নিশ্চয়ই আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ! তাকে বললাম, আমাদের কাছে সত্যিই অবিশ্বাস্য লাগছে যে একজন মানুষ ৮৬০০ মিটার উচ্চতায় অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া একটা পুরো রাত কাটিয়ে দিল। তার সঙ্গে পর্বতারোহণের প্রয়োজনীয় কোনো জিনিসপত্র নেই এবং এখনো বেঁচে আছে।’

পর্বতারোহী দলটির সহযোগিতায় হলকে রেসকিউ করে নর্থ কোল দিয়ে এডভান্স বেস ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। ওই ঘটনায় ফ্রস্টবাইট-এ হলের আঙ্গুলের ডগা ও পায়ের পাতা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

নর্থ সাইড ও সাউথ সাইড দিয়ে এভারেস্ট চূড়া অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় নানা সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। সে তুলনায় ইস্ট সাইড বা কাংশুং ফেসে এখনো তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা নেই। সহজে চলাচলের পথ এখনো তৈরি হয় নি। কাংশুং ফেস অভিযানে প্রথমে লাসা পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে তিন দিনের গাড়ি পথ খার্তা। খার্তা থেকেই মূলত ট্রেকিং শুরু। আর এই পথে খার্তা নদী সঙ্গ দেয়। দেখা মেলে তিব্বতীয় জীব বৈচিত্র্য। খার্তা হতে ১ম দিন ৪-৫ ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছানো যাবে ল্যান্ডরাবলিংয়ে। ২য় দিন জোরপোখারি পৌঁছাতে ৩-৪ ঘন্টার ট্রেকিং পথ পাড়ি দিতে হয়। ৩য় দিন ৬-৭ ঘন্টা ট্রেক করে পৌঁছানো যায় জকসামে। পরবর্তী দিন সামথাং পৌঁছাতে সময় লাগবে ৫-৬ ঘণ্টা। ৫ম দিনে পারথাং হয়ে ৬ষ্ঠ দিনে আরও ৪-৫ ঘণ্টা ট্রেক করে পৌঁছানো যাবে ৪৯৬০ মিটার উচ্চতায় পেথাং রিংমো নামক জায়গায়। যারা শুধু কাংশুং বেজ ক্যাম্প ট্রেকে যায় তাদের জন্য এটাই শেষ ক্যাম্প। কাংশুং বেজ ক্যাম্প প্রায় ৫৩২০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখান থেকেই এভারেস্ট অভিযাত্রীদের অভিযান পরিচালনা হয়।

(পাদটীকা: একজন পর্বতারোহী হিসেবে এভারেস্ট জয় আমার স্বপ্ন। সেকারণেই কাংশুং ফেস সম্পর্কে একটু বাড়তি জানার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা নেই। আন্তর্জাতিক কয়েকটি জার্নালে পর্বতারোহীদের লেখা ও ইন্টারনেট দুনিয়া ঘেঁটে এই লেখাটি তৈরি করা।)

লেখক: পর্বতারোহী

https://www.kalerkantho.com/