যে প্রাসাদে সাড়ে চার শ বছর ধরে চলছে কোরআন তিলাওয়াত

1

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা: তুরস্কের বিখ্যাত লেখক ও কবি ইয়াহইয়া কামাল বায়াতলি (১৯২০ সালে) বলেছিলেন, ‘আমি একটি সত্য উদঘাটন করেছি। তা হলো এই রাষ্ট্র দুটি নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে : এক. আজান। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের নির্দেশে আয়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মসজিদের মিনারে যা ধ্বনিত হয়েছিল এবং তা এখনো ধ্বনিত হয়; দুই. কোরআন তিলাওয়াত। সুলতান প্রথম সেলিম তোপকাপি প্রাসাদের ‘হিরকায়ে সাদেত দাইরেজি’-তে (সৌভাগ্যের স্মৃতিস্মারক সংরক্ষণ কক্ষ) যা তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানেও তা তিলাওয়াত করা হচ্ছে।

সাড়ে চার শ বছর ধরে চলছে কোরআন তিলাওয়াত : তুরস্কে উসমানীয়রা ছয় শ বছরের বেশি সময় শাসন করেন। এই দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কোরআনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। বিশেষত তুর্কি শিল্প-সাহিত্যেও কোরআনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। কোরআনের প্রতি তুর্কি শাসকদের ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন হলো চার শ বছর ধরে কোপকাপি প্রাসাদে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা অবিরতভাবে কোরআন তিলাওয়াত হওয়া, যা ১৫১৭ সালে শুরু হয়। ১৯২৩ সালে তুর্কি রিপাবলিক ঘোষণার পর থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। মধ্যবর্তী এই ৪৬ বছর ছাড়া সাড়ে চার শ বছরেরও বেশি সময় রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে তোপকাপি প্রাসাদে।

নবীপ্রেম থেকেই তিলাওয়াত : কোরআনের প্রতি যে ভালোবাসার কারণে চার শ নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর তিলাওয়াত হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। মূলত কোরআন ও নবীপ্রেম উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্যতম আধ্যাত্মিক অবলম্বন। সুলতান প্রথম সেলিম, যিনি নিজেকে মক্কা-মদিনার সেবক হিসেবে পরিচয় দিতেন। যখন মামলুকদের পরাজিত করে মিসর জয় করেন, তখন মক্কা ও মদিনা তাঁর শাসনাধীন হয়। মক্কা ও মদিনার তৎকালীন আমির শরিফ আবু নুমাই ইবনে আবুল বারাকাত সুলতান সেলিমের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে চিঠি প্রেরণ করেন এবং পবিত্র দুই নগরীর চাবিও পাঠিয়ে দেন। শরিফ আবু নুমাই চাবির সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক যুগের কিছু নিদর্শনও পাঠান। দাবি করা হয়, এগুলো মহানবী (সা.) ও তাঁর কয়েকজন সাহাবির স্মৃতিস্মারক।

মক্কা-মদিনার আমিরের আনুগত্য ও পবিত্র দুই মসজিদের খুতবায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সুলতান প্রথম সেলিম অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি মিসরে থাকতেই শরিফ আবু নুমাইয়ের উদ্দেশে বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন পাঠান। ব্যক্তিগত উপহারের পাশাপাশি তিনি মক্কা ও মদিনার অধিবাসীদের জন্য সোনার দুই লাখ টুকরা (সম্ভবত মুদ্রা) ও খাদ্যশস্য ভর্তি একাধিক জাহাজ প্রেরণ করেন। সুলতান সিদ্ধান্ত নেন ‘স্মৃতিস্মারক’গুলো ইস্তাম্বুলে নিয়ে আসবেন। এগুলো মূলত মামলুক শাসকদের সংরক্ষণে ছিল এবং ইস্তাম্বুলে আনা কিছু স্মারক কায়রো ও সিরিয়া থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছিল।

যেভাবে তিলাওয়াতের সূচনা : সুলতান স্মৃতিস্মারক জাহাজে ওঠানো থেকে ইস্তাম্বুলে পৌঁছানো পর্যন্ত দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিলেন। সুলতান নিজেও তিলাওয়াতে অংশ নেন। ইস্তাম্বুলে পৌঁছানোর পর তোপকাপি প্রাসাদে নিজের একান্ত কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া কক্ষে স্মারকগুলো সংরক্ষণ করেন। তিনি সেখানে সার্বক্ষণিক কোরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। তুর্কি প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর প্রায় ৫০ বছর কোরআন তিলাওয়াত বন্ধ ছিল। ১৯৬৯ সালে তুর্কি ঐতিহাসিক ও সংগীতজ্ঞ ইলমাজ ইজতুনা—যিনি ‘মানুষের ভালোবাসার স্রষ্টা’ নামে পরিচিত, তিনি যখন ‘ডেপুটি’ নির্বাচিত হন, তখন সরকারের সমর্থনে পুনরায় কোরআন তিলাওয়াতের ধারা শুরু হয়। বর্তমানে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব : দরবারে সুলতানের উপস্থিতিতে কোরআন তিলাওয়াত ও তার ব্যাখ্যা করা হতো। কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রাসাদ, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর অলংকরণ করা হতো। কোরআনের প্রতি সুলতানদের ভালোবাসার প্রভাব পড়েছিল জনসাধারণের ওপর। ফলে তুরস্কে কোরআনের অনুলিপি ক্যালিগ্রাফিশিল্পে উন্নীত হয়েছিল। গর্ভবতী নারীর পাশে বসে সুললিত কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করা হতো, যেন তার প্রভাব ও বরকত সন্তানের ওপর পড়ে। শিশুরা চার বছর বয়স থেকে পরিবারে কোরআনের পাঠ শুরু করত। শিশুরা প্রথম কোরআন পাঠ সম্পন্ন করলে তাকে অভিনন্দন জানাতে ‘আমিন আলাই’ বা ‘হাতিম’ নামক উৎসবের আয়োজন করা হতো।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে