মসজিদুল আকসার সর্বশেষ উসমানীয় প্রহরী

4

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ: প্রায় ৪০০ বছর ফিলিস্তিন শাসনের পর ১৯১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশদের কাছে উসমানি সেনাবাহিনী জেরুজালেম ছেড়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার সময় মসজিদুল আকসার নিরাপত্তায় ছোট্ট রিয়ারগার্ড বাহিনী রেখে যায়। ঐতিহ্য অনুসারে যুদ্ধজয়ীরা দখলকৃত শহরের রিয়ারগার্ড সেনাদের কখনো যুদ্ধবন্দি হিসেবে বিবেচনা করে না। আল আকসায় নিয়োজিত সেই রিয়ারগার্ড বাহিনীর সর্বশেষ সদস্য ছিলেন করপোরাল হাসান।

কে এই করপোরাল হাসান? : তুরস্কের ইদগির প্রদেশের করপোরাল হাসান ছিলেন আল আকসার সর্বশেষ প্রহরী। তিনি ছিলেন অটোমান সেনাবাহিনীর ভারী মেশিনগান দলের একজন সদস্য। ১৯৮২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যিনি উসমানি সেনাবাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে দীর্ঘ ৫৭ বছর জেরুজালেমের পবিত্র মসজিদুল আকসার প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

যেভাবে পরিচয় উদ্ধার হয় : ১৯৭২ সালের ৪ মে তুরস্কের ইসরায়েল ও জেরুজালেম পরিদর্শনে যাওয়া রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন সাংবাদিক ইলহান বারদাকসি। এ ভ্রমণের সময় তাঁরা করপোরাল হাসানের পরিচয় উদ্ধার করেন। ইলহান বলেন, ‘ইসরায়েল সরকার আমাদের জন্য ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে। আমি জেরুজালেম ও মসজিদুল আকসা দেখার অপেক্ষায় থাকি। অবশেষে আমরা মসজিদের উঁচু প্রাঙ্গণে গিয়ে উঠি। এই স্থানটি ‘ফিনাউ ইসনাই আশারা আলফি শুমআতান’ বা এক হাজার ২০০ মোমবাতির চত্বর নামে ইতিহাসে পরিচিত। কেননা ১৫১৬ সালে সুলতান প্রথম সেলিম জেরুজালেম বিজয় করে তাতে এক হাজার ২০০ মোমবাতি জ্বালিয়েছেন। সাংবাদিক ইলহান আল আকসা মসজিদ চত্বরে একজন বয়োবৃদ্ধ লোককে দেখতে পান। তাঁর গায়ে খুবই পুরনো কাপড়। বয়স প্রায় ৯০ বছর হবে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তাঁর গায়ের কাপড়ে অনেক তালি দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাকে বৃদ্ধ  সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘আমি তাঁকে চিনি না। হয়তো কোনো পাগল হবেন। তিনি সব সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। কখনো কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কিছু জিজ্ঞেসও করেন না। কারো দিকে তাকান না।’ কর্মকর্তার উত্তরে ইলহান সন্তুষ্ট হলেন না, বরং নিজেই তাঁর সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলেন। তবে ভাবছিলেন প্রায় ৯০ বছর বয়সী এই প্রবীণ তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন কি না। ইলহান বৃদ্ধকে সালাম দিলেন। বিরক্তি ভাব নিয়ে বৃদ্ধ সালামের উত্তর দেন। সালামের সুরে তুর্কি ভাব ছিল। ইলহান বলেন, ‘আমার হাত কাঁপা শুরু করে। তাহলে ইনি কি তুর্কি? এখানে কী করছেন জিজ্ঞেস করলে বৃদ্ধ জবাব দেন যে তিনি করপোরাল হাসান। অটোমান সেনাবাহিনীর ২০তম করপোরেশন, ৩৬তম ব্যাটালিয়ন ও অষ্টম স্কোয়াড্রন ভারী মেশিনগান দলের সদস্য তিনি।’

যেভাবে আল আকসার প্রহরায় তিনি : তিনি বললেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমাদের সেনারা সুয়েজ খাল ফ্রন্টে ব্রিটিশদের ওপর হামলা করেছিল। আমাদের সেনাবাহিনী তাতে পরাজিত হয়। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা জেরুজালেম ফটকে ঢুকে শহরটি দখল করে নেয়। আর আমরা পবিত্র শহরের নিরাপত্তা দিতে রিয়ারগার্ড (জবধত্মঁধত্ফ) হিসেবে রয়ে যাই। ইংরেজরা তাদের অবস্থানরীতি অনুসারে আমাদের মেনে নেয়। আমরা এখানে ৫৩ জন সদস্য ছিলাম। এমন সময় মন্ড্রোস চুক্তির আলোকে উসমানি সেনাবাহিনীকে ক্ষমতাচ্যুত করার খবর পাই। তখন ক্যাপ্টেন মোস্তফা আল-ইউজবাশি রক্ষী সেনাদের বলেন, প্রিয় বীর সেনারা, উসমানি সাম্রাজ্য কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। আমাদের গৌরবময় সেনাদের দেশছাড়া করা হচ্ছে। প্রিয় ইস্তাম্বুল আমাকে ডাকছে। এ ডাকে সাড়া দিতে হবে। নতুবা নির্দেশ অমান্য করেছি বলে বলা হবে। তোমাদের কেউ চাইলে স্বদেশে ফিরতে পারবে। আমি বলব, আল কুদস বা জেরুজালেম সুলতান সেলিমের রেখে যাওয়া আমানত। তা ফেলে যাওয়া আমাদের উচিত হবে না। তাই আপনাদের এখানে পাহারার দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করব যেন কেউ বলতে না পারে, উসমানীয় সেনারা চলে গেছে।’

আল আকসার নিঃসঙ্গ প্রহরী : অতঃপর বৃদ্ধ বলেন, ‘আমরা কিছু লোক জেরুজালেমে রয়ে যাই। একে একে আমার সঙ্গীরা ইহকাল থেকে বিদায় নেয়। এখন একমাত্র আমি করপোরাল হাসান আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছর পবিত্র আল আকসা পাহারার দায়িত্ব পালন করছি। আপনি আনাতোলিয়ায় গেলে তোকাত সানজাক এলাকায় যাবেন। সেখানে আমার কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মোস্তফার সঙ্গে দেখা করবেন। তাঁকে বলবেন, আপনার নির্দেশনা মতে ইগদির প্রদেশের করপোরাল হাসান আজ পর্যন্ত জেরুজালেমে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মসজিদুল আকসার শেষ প্রহরীর বিদায় : ফেরার সময় সাংবাদিক ইলহান স্থানীয় একজন গাইডকে পুরো ঘটনা জানান এবং নিজের ঠিকানা দিয়ে বলেন, বৃদ্ধের সব খবর যেন তাঁকে জানায়। ১৯৮২ সালে জেরুজালেম থেকে আসা এক টেলিগ্রামে জানানো হয় যে আজ মসজিদুল আকসার সর্বশেষ প্রহরী মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।’

সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড