বর্ধিত খেলাপি ঋণে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংক

0
0

নিউজ ডেস্ক: বর্ধিত খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো পড়েছে মহাবিপাকে। এক দিকে নতুন ব্যাংক হওয়ায় আমানত সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ, অপর দিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কমে যাচ্ছে মুনাফা। সব দিক থেকেই ব্যাংকগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জুন শেষে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮৩ হাজার ৬৪২ কোটি টাকাই কুঋণ। অর্থাৎ মোট খেলাপি ঋণের ৮৭ শতাংশই কুঋণ বা আদায় অযোগ্য। মন্দ ঋণের কারণে প্রভিশন সংরক্ষণও করতে হচ্ছে বেশি হারে। জুন শেষে ৬৫ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো আলোচ্য সময়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পেরেছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি, বরং এ সময়ে ঘাটতি রয়েছে, প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি।

প্রচলিত বিধান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় মুনাফা থেকে। খেলাপি ঋণের শ্রেণিভেদে প্রভিশন সংরক্ষণের হারও পরিবর্তন হয়। কোনো খেলাপি ঋণ নিম্নমানের হলে ওই খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আবার কোনো খেলাপি ঋণ সন্দেহজনক হলে তার বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং কোনো খেলাপি ঋণ কুঋণ বা মন্দমানের ঋণ হলে তার বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষা করতে। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি হলে বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

ব্যাংকাররা জানান, নানা কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান নীতিমালা শিথিল হওয়ায় এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ঋণখেলাপিরা বছরের পর বছর ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। উপরন্তু ঋণখেলাপিদের ছাড় দিতে বিভিন্ন সময় নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে; যা এখনো বিদ্যমান। সর্বশেষ খেলাপিদের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থাৎ ১০ বছরের জন্য ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। এতে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারা ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। আবার করোনার কারণে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপিদেরও বিশেষভাবে ছাড় দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে এ সময়ের মধ্যে কেউ ঋণ পরিশোধ না করলে তাদেরকে খেলাপি বলা যাবে না। এতে পোয়াবারো হয়েছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের। তারা ঋণ পরিশোধ না করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। এভাবেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকাররা জানান, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা তলানিতে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস সীমিত পরিসরে ব্যাংক লেনদেন হয়। এ সময়ে টাকা উত্তোলনের হারই বেশি ছিল। আবার ঋণ আদায় কার্যক্রম কার্যত বন্ধ। বিপরীতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঠিকই সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এক দিকে আয় কমে যাচ্ছে, অপর দিকে বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়। সব মিলে ব্যাংকগুলোতে এখন ত্রাহি অবস্থা।

নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, পুরনো ব্যাংকগুলোর চেয়ে নতুন ব্যাংকগুলোর অবস্থা বিভিন্ন কারণে খারাপ। প্রথমত, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ ঠিক করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ৯ শতাংশের বেশি হারে নতুন পুরনো কোনো ব্যাংকই ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। এ কারণে আমানতের সুদহার বেশির ভাগ ব্যাংকই ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু নতুন ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। কারণ, সাবেক ফারমার্স ব্যাংক বর্তমানে নতুন নামে পদ্মা ব্যাংকের কারণে নতুন ব্যাংকগুলো কিছুটা আস্থার সঙ্কটে পড়েছে। ৬ শতাংশ সুদে পুরনো ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখতে গ্রাহক যতটুকু ভরসা পাচ্ছেন, নতুন ব্যাংকগুলোতে ততটুকু ভরসা পাচ্ছেন না।

এ কারণে পুরনো ব্যাংকগুলোর চেয়ে কিছুটা বেশি হারে নতুন ব্যাংকগুলোকে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো ব্যাংকগুলোর চেয়ে নতুন ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হচ্ছে। কিন্তু ঋণ বিতরণে বেশি মুনাফা আদায় করতে পারছে না। এতে নতুন ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে। অপর দিকে খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে বেশি। এতে মুনাফা যেটুকু করা হচ্ছে তার বেশির ভাগই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে। সামনে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here